সম্প্রতি স্পেন ও ফ্রান্সে ভয়াবহ দাবানলের জন্য দায়ী চরম আবহাওয়ার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের স্পষ্ট ছাপ খুঁজে পেয়েছে দুটি পৃথক গবেষণা। ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশনের বিজ্ঞানীরা এক দ্রুত বিশ্লেষণে জানান, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন স্পেনের রেকর্ড আকারের অগ্নিকাণ্ডের জন্য প্রয়োজনীয় উত্তপ্ত ও শুষ্ক পরিবেশ তৈরির সম্ভাবনা ২০ গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। একই কারণে ফ্রান্সের দাবানলের জন্য চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি দ্বিগুণ হয়েছে।
গবেষণায় আরও উঠে আসে, গত ২৬ বছরের উষ্ণায়ন স্পেনে তীব্র অগ্নিঝুঁকির সম্ভাবনা তিনগুণ এবং ফ্রান্সে তা ৪০% বৃদ্ধি করেছে। একই সময়ে, 'সায়েন্টিফিক রিপোর্টস' জার্নালে প্রকাশিত অপর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দক্ষিণ ইউরোপে অতি প্রতিকূল অগ্নিঝ্রিপূর্ণ আবহাওয়ার দিনের সংখ্যা কয়েক দশক আগের তুলনায় দ্বিগুণের বেশিিয়েছে। এখন বছরে গড়ে প্রায় ২৫ দিন এমন চরম অবস্থা দেখা যায়, যা আগে ছিল প্রায় ১০ দিন। এই দিনগুলো কেবল বেশি ঘন ঘন হচ্ছে তা নয়, ১৯৮১-২০১০ সময়কালের চেয়ে ৫০% বেশি তীব্রও হয়েছে।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের জলবায়ু বিজ্ঞানী ও ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশনের সমন্বয়ক ফ্রাইডেরিক ওটো মন্তব্য করেন, “স্পেনের অগ্নি-আবহাওয়ার যে পরিবর্তন দেখা গেছে তা সত্যিই অত্যন্ত মজবুত এবং আমার দেখা বৃহত্তম পরিবর্তনগুলোর একটি।” প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রেকর্ড উষ্ণতম গ্রীষ্মের আগে জানুয়ারিতে অত্যধিক বৃষ্টির ফলে গাছপালার বৃদ্ধি ঘটে, যা পরবর্তী তীব্র খরার কারণে প্রচুর অগ্নি-জ্বালানিতে পরিণত হয়। এছাড়া জমি পরিত্যাক্ত হয়ে যাওয়ার সমস্যাও পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে বলে জানান ওটো।
গবেষকদল কয়লা, তেল ও গ্যাস পোড়ানোর মাধ্যমে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে এই তীব্রতার দাবানলের সম্ভাবনা বাড়িয়েছে, তা পরিমাপ করে দেখিয়েছেন। তাঁরা আগুনের আবহাওয়ার বর্তমান মাত্রার সঙ্গে অতীতের তথ্য এবং যদি পৃথিবী ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস শীতল থাকত, সেই অনুমিত অবস্থার তুলনা করেছেন। সিরাকিউজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্নি বিজ্ঞানী জ্যাকব বেন্ডিক্স, যিনি এই গবেষণার সাথে জড়িত না, বলেন, “অত্যন্ত তাপ ও খরার পরিস্থিতিতে আগুন সহজেই জ্বলে ও আরও বিস্ফোরকভাবে ছড়ায়, এটা আমরা জানি। নৃতাত্ত্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এসব চরম পরিস্থিতি আরও সাধারণ হয়ে উঠছে, এটাও আমরা কয়েক দশক ধরে জানি।”
নেদারল্যান্ডসের গ্রোনিঙেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবিজ্ঞানী ও দ্বিতীয় গবেষণার লেখক রাউল কোর্দারো বলেন, ১৯৮০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত উন্নত দমনের ব্যবস্থাপনার কারণে ইউরোপে অগ্নিকাণ্ড ও পোড়া জমির পরিমাণ অনেক কমেছিল। কিন্তু তখন জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ তা ধ্বংস করে দেয়। তিনি বলেন, “যখন আবহাওয়া এত চরম হয়, তখন আপনার কাছে কত সম্পদ বা অর্থ আছে তা গুরুত্বপূর্ণ নয়, আপনি আগুনের বিস্তার রোধ করতে পারেন না।” ওটো স্পস্ট করে বলেন, “আমাদের জীবাশ্ম জ্বালানী পোড়ানো বন্ধ করতে হবে, কারণ যতদিন আমরা এটি চালিয়ে যাব, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়তে থাকবে এবং আগুনের পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাবে।”




