বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে সরকারি অর্থ বরাদ্দ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে মাগুরা জেলার একটি ঘটনা। শালিখা উপজেলার চুকিনগর এলাকায় অবস্থিত মুন্সী শহিদুর রহমান বিএম কলেজে নিয়মিত কোনো শিক্ষা কার্যক্রম না থাকার পরও সেখানে ভবন নির্মাণের জন্য সরকারি তহবিল থেকে দেড় কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কলেজটির বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত জীর্ণ। জরাজীর্ণ দুটি আধাপাকা ও টিনশেড ভবন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। বেশির ভাগ কক্ষ তালাবদ্ধ, দরজায় মরিচা ধরেছে। খোলা কক্ষের ভেতর ধুলোবালি ও আবর্জনা জমে আছে। চারপাশে আগাছা ও ঝোপঝাড়, বারান্দায় ঘাস জন্মেছে। প্রতিষ্ঠানের কোনো নামফলক না থাকায় দূর থেকে এটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বলে চেনার উপায় নেই।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর প্রথম কয়েক বছর কিছু শিক্ষার্থী ছিল। কিন্তু গত প্রায় সাত বছর ধরে এখানে নিয়মিত পড়াশোনা বন্ধ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দার ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তারা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় সঠিকভাবে পরিচালনা সম্ভব হয়নি। এ কারণে শিক্ষার্থীরা চলে যায় এবং প্রতিষ্ঠানটি স্থবির হয়ে পড়ে।
অধ্যক্ষ মো. কামরুজ্জামান নবাব অবশ্য দাবি করেন, প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি রয়েছে। তিনি বলেন, 'প্রতি বছর শিক্ষার্থীরা বোর্ড পরীক্ষায় অংশ নেয়। চলতি বছর ১৫ জন উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে। পরীক্ষা চলায় প্রতিষ্ঠান বন্ধ।' তাঁর মতে, বেশির ভাগ শিক্ষার্থী চাকরিজীবী হওয়ায় নিয়মিত আসে না। অধ্যক্ষ জানান, তিনিসহ ১৪ জন শিক্ষক-কর্মচারী খণ্ডকালীন কর্মরত। জীর্ণ ভবন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন মামলায় জর্জরিত হওয়ার কারণে প্রতিষ্ঠানটি ঠিকমতো এগোতে পারেনি। নতুন ভবন পেলে আবার ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে।
জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পরিচালন বাজেটের আওতায় মাগুরার দুটি সংসদীয় আসনের ছয়টি প্রতিষ্ঠানে ভবন নির্মাণের জন্য দেড় কোটি টাকা করে বরাদ্দ দিয়েছে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর। স্থানীয় সংসদ সদস্যদের আধা সরকারি পত্রের (ডিও) ভিত্তিতে এই বরাদ্দ দেওয়া হয়। বরাদ্দের চিঠিতে দরপত্র আহ্বানের আগে নির্বাহী প্রকৌশলীকে সরেজমিন জরিপ ও মাটি পরীক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শালিখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানভীর হাসান চৌধুরী বলেন, সম্প্রতি তিনি ওই প্রতিষ্ঠানে মাটি ফেলার কাজ তদারকি করলেও ভবনের ভেতরে প্রবেশ করেননি। তিনি কলেজটি চালু আছে বলে শুনেছেন, তবে একাডেমিক কার্যক্রম সম্পর্কে নিশ্চিত নন।
মাগুরা জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী সরকার হারুন অর রশিদ জানান, জরিপ প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বর্তমান জরিপ ফরমে শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে নির্দিষ্ট তথ্য চাওয়া না হলেও মন্তব্য কলাম রয়েছে, যেখানে অসঙ্গতি তুলে ধরা যাবে।
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর খুলনা বিভাগের পরিচালক মো. হুসাইন শওকত তথ্য দিতে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করতে বলেছেন। জেলা শিক্ষা অধিদপ্তর জানিয়েছে, বিএম কলেজগুলো কারিগরি বোর্ডের আওতায় থাকায় তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।
মাগুরার একটি বেসরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ কাজী নজরুল ইসলাম এই বরাদ্দের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, যেসব প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন পাঠদান নেই সেখানে বড় অঙ্কের বরাদ্দ দেওয়ার আগে একাডেমিক সক্ষমতা যাচাই করা উচিত। শিক্ষার মান ও শিক্ষার্থীর উপস্থিতিই মূল বিবেচ্য হওয়া দরকার। বিতর্ক সত্ত্বেও বরাদ্দের প্রক্রিয়া এগিয়ে চলেছে।




