মহাকাশ এখন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে নতুন এক শ্রেষ্ঠত্বের রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। বাণিজ্য ও ভূরাজনীতির বাইরে চাঁদে স্থায়ী আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, চীন যেকোনো মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রকে টেক্কা দিতে পারে।

আইজ্যাকম্যানের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এখন মহাকাশ প্রতিযোগিতার এমন এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে, যার মূল লক্ষ্য ভবিষ্যতে চাঁদে মানব মিশন পরিচালনা। এখন দেখার বিষয়, কোন দেশ প্রথমে সফলভাবে মানুষকে চাঁদে ফিরিয়ে আনতে পারে। তিনি মন্তব্য করেন, 'আমরা নিশ্চিতভাবে একটি মহাকাশ প্রতিযোগিতার মধ্যে আছি। চীন অবিশ্বাস্য গতিতে এগিয়ে চলেছে। চীনা তাইকোনটরা যে চাঁদে অবতরণ করবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আসল প্রশ্ন হলো, তারা পৌঁছানোর আগে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে ফিরে যেতে পারবে কি না।'

নাসাপ্রধান আরও উল্লেখ করেন, চীন যে তীব্র গতি ও সক্ষমতা প্রদর্শন করছে, তা স্নায়ুযুদ্ধের প্রথম মহাকাশ প্রতিযোগিতার সময় সোভিয়েত ইউনিয়নেরও ছিল না। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের চন্দ্রাভিযান কর্মসূচির প্রস্তুতি কিছুটা শঙ্কা তৈরি করছে। নাসার চন্দ্র ঘাঁটি কর্মসূচির প্রধান কার্লোস গার্সিয়া-গ্যালান আসন্ন মানুষবাহী অভিযানের প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। আর্টেমিস মিশনের সময়সূচি ইতোমধ্যে একাধিকবার পিছিয়েছে। পূর্বে ২০২৭ সালে আর্টেমিস-৩ মিশনের আওতায় চাঁদে অবতরণের পরিকল্পনা থাকলেও তা সংশোধন করে এখন ২০২৮ সালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং এটি আর্টেমিস-৪ মিশনের অধীনে সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আইজ্যাকম্যান জানান, আর্টেমিস-৩ মিশনের সময় পৃথিবীর কক্ষপথে একসঙ্গে বিশ্বের তিনটি শক্তিশালী রকেটের সক্ষমতা যাচাই করা হবে। এই ঘটনা ১৯৬৯ সালের অ্যাপোলো-৯ মিশনের মতোই এক ঐতিহাসিক মূহুর্ত সৃষ্টি করবে এবং ২০২৮ সালের আর্টেমিস-৪ মিশনের ল্যান্ডারগুলোর প্রতি নাসার আস্থা বহুলাংশে বৃদ্ধি করবে।

পর্যায়ক্রমে চাঁদে মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিত করার নীলনকশা তৈরি করেছে নাসা। এ কারণে ২০২৯ সালের মধ্যে নভোচারীদের নিয়মিতভাবে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও প্রযুক্তিগত পরীক্ষার জন্য চন্দ্রপৃষ্ঠে যাতায়াতের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে চান বিজ্ঞানীরা। নিয়মিত যাতায়াত সুসংহত হওয়ার পর একটি স্থায়ী চন্দ্র ঘাঁটির প্রাথমিক অবকাঠামো নির্মাণ শুরু হবে। নাসা ২০৩২ সালের মধ্যে চাঁদের বুকে মানুষের নিরবচ্ছিন্ন ও স্থায়ী অবস্থান বজায় রাখার স্বপ্ন দেখছে।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, বর্তমান প্রতিযোগিতা কেবল স্নায়ুযুদ্ধকালীন বৈশ্বিক মর্যাদার লড়াই নয়। এর মুখ্য উদ্দেশ্য হলো চাঁদের কৌশলগত সম্পদ, বিশেষত দক্ষিণ মেরুর বরফের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। এই বরফ গলিয়ে রকেটের জ্বালানি উৎপাদন সম্ভব হবে। পাশাপাশি, মঙ্গল অভিযানের পথে চাঁদকে একটি জ্বালানি সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রাথমিক কাঠামো আগেভাগেই নির্মাণ করতে চায় উভয় দেশ। তাই চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণই চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়; সেখানে পৌঁছানোর পরই প্রকৃত প্রতিযোগিতা শুরু হবে।