হুট করে নাজমুল হোসেন শান্তকে সরিয়ে দেওয়ার সমালোচনার মধ্য দিয়েই মেহেদী হাসান মিরাজের নেতৃত্ব অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল। ২০২৫ সালের জুনের ওই বিতর্কিত সিদ্ধান্তে অভিমান করে টেস্ট অধিনায়কত্ব ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন নাজমুল, যদিও পরবর্তীকালে তিনি সিদ্ধান্ত পাল্টান। ওয়ানডেতে মিরাজের সহ-অধিনায়কের দায়িত্বেও ছিলেন তিনিই। গতকাল বিসিবি সভাপতি তামিম ইককাল জানিয়ে দিয়েছেন, ওয়ানডে দলের নয়া অধিনায়ক হিসেবে লিটন কুমার দাসকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং তাওহিদ হৃদয় হয়েছেন নতুন সহ-অধিনায়ক।
মিরাজকে এই দায়িত্ব থেকে সরানোর পেছনে তার নেতৃত্বের সাফল্য বা ব্যর্থতাকে কারণ হিসেবে দেখাতে নারাজ বিসিবি। তামিম ইককাল ব্যাখ্যা দিয়েছেন, বোর্ডের চিন্তা অনুযায়ী লাল বল ও সাদা বলের ক্রিকেটের জন্য আলাদা দুই জন অধিনায়ক থাকাই শুভ। এমনকি ভবিষ্যতে নেতৃত্বের বিবেচনায় মিরাজ আবারও বিবেচিত হতে পারেন বলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।
তবে মিরাজের জন্য বিগত এক বছর মিশ্র অভিজ্ঞতার ছিল। চরম সফলতা ও চরম ব্যর্থতা— দুইয়েরই মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। অধিনায়ক হিসেবে প্রথম দশ ম্যাচে তার দল জয় পেয়েছিল মাত্র একটিতে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক হিসেবে নেমে ধবলধোলাই হয়েছিল বাংলাদেশ। পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পাওয়ার পর ২০২৫ সালের জুনে শ্রীলঙ্কার কাছেও সিরিজ হারে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিরপেক্ষ ভেন্যুতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে আবারও ধবলধোলাইয়ের শিকার হয়। এই সময়কালে তার ব্যক্তিগত ফর্মও হতাশাজনক ছিল, প্রথম পাঁচ ম্যাগে তিনি পেয়েছিলেন মাত্র দুটি উইকেট। যদিও ব্যাট হাতে তিনটি ফিফটি আসে, তবু ব্যাটিংয়ের ধরণ নিয়ে তীব্র সমালোচনা ও দর্শকদের দুয়ো শোনার অভিজ্ঞতাও কম হয়নি তার।
মিরাজের নেতৃত্বের ভাগ্য ফিরতে শুরু করে ২০২৫ সালের অক্টোবরে নিজেদের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজ থেকে। স্পিন-সহায়ক উইকেটকে কাজে লাগিয়ে সেবার ২-১ ব্যাবধানে জিতে বাংলাদেশ। এর পর থেকে টানা তিনটি সিরিজে পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয়ের ধারা অব্যাহত থাকে। ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের চিত্রও বদলায়, শেষ চৌদ্দ ম্যাগে বল হাতে ১৪টি উইকেট নেন মিরাজ এবং তার ইকোনমি রেট ৩.৮৬-এ নেমে আসে। কিন্তু তারপরও পুরোপুরি স্বস্তি পাননি তিনি। দলের অভ্যন্তরে ও বাইরে তার একাগ দল নির্বাচন, বোলিং বদল ও ব্যাটিং অর্ডার নির্ধারণী প্রশ্ন ছিল। এই মাসে জিম্বাবুয়ের কাছে সিরিজ হেরে টানা চার সিরিজ জয়ের ধারাও থেমে যায় এবং সেটিই তার অধিনায়ক হিসেবে শেষ অভিযান।
সব মিলিয়ে ২৪টি ওয়ানডে ম্যাগে নেতৃত্ব দিয়ে মিরাজের অর্জন ১০ জয় ও ১৩ পরাজয়, একটি পরিত্যক্ত হয়। তামিম ইক্কার স্পষ্ট করে জানান, নেতৃত্বের পারফরম্যান্স নিয়ে কোনো প্রশ্ন ছিল না, বরং ব্যক্তিগত ক্রীড়ানৈপুণ্যে মিরাজ যেন আরও উজ্জ্বল হতে পারেন, সেই ভাবনা থেকেই তাকে অধিনায়কত্ব থেকে মুক্ত করা হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২৪ ম্যাগে ২১ ইনিংসে ব্যাট করে ২৭.২২ গড়ে ও ৭১.৩২ স্ট্রাইক রেটে তার রান ৪৯০। অন্যদিকে বল হাতে ৪.৪২ ইকোনমিতে ২৪টি উইকেট নিয়েছেন।
মিরাজের প্রস্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আবার ফিরে গেল দুই অধিনায়কের রীতিতে। এর ব্যাখ্যায় তামিম ইক্কাল জানান, সম্প্রতি অনেক ক্রিকেটার চোটে পড়েছেন। তিন সংস্করণে ভিন্ন ভিন্ন অধিনায়ক থাকলে প্রত্যেকেই তার দলে সেরা খেলোয়াড় খেলাতে চাইতেন, যা সমন্বয়ে জটিলতা তৈরি করে। দুই অধিনায়কের ব্যবস্থায় এই সমন্বয় সহজ হবে বলে বিশ্বাস বোর্ড সভাপতির। মিরাজও এমন পরিকল্পনার বক্তব্যে কোনো আপত্তি করেননি। ২০১৬ সালে যুব বিশ্বকাপ জেতানো এই নেতার জাতীয় দলের নীরত্বে ধারাবাহিকতার আশা ভক্তদের ছিল, কিন্তু আপাতত সেই পথে বিরতি পড়ল। ভবিষ্যতে তিনি ফিরবেন কিনা, তা নির্ধারণ করবে সময়।




