কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) যে চাকরি ধ্বংস করবে না, বরং নির্দিষ্ট কিছু কাজকে স্বয়ংক্রিয় করে তুলবে—এমনই মতামত দিয়েছেন এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জেনসেন হুয়াং। সম্প্রতি সান ফ্রান্সিসকোতে ওয়াই কম্বিনেটরের স্টার্টআপ স্কুলে এক বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন। সিলিকন ভ্যালির এই শীর্ষ উদ্যোক্তা ত্বরণকারী প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত ভিডিওতে হুয়াং স্পষ্ট করেন, 'অনেক কাজ স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাবে। প্রতিটি চাকরিই পরিবর্তিত হবে এবং একগুচ্ছ নতুন চাকরির সৃষ্টি হবে।' তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, কাজ আর চাকরি এক নয়। তাই তিনি এআই-এর শীর্ষ নেতাদের ভবিষ্যদ্বাণী করা হোয়াইট-কলার চাকরির 'বড় ধস'কে ভুল বলে প্রত্যাখ্যান করেন। হুয়াংয়ের মতে, এআই আসলে আরও বেশি চাকরি নিয়ে আসবে, কম নয়। তিনি বলেন, 'এআই চাকরি ধ্বংস করছে—এই বর্ণনা পুরোপুরি ভুল। এআই কাজগুলোকে স্বয়ংক্রিয় করে, কিন্তু চাকরি নির্মূল করে না।' তবে কোম্পানিগুলো যত বেশি এআই গ্রহণ করছে, হোয়াইট-কলার চাকরি হারানোর সংখ্যা ততই কঠোর বাস্তবতা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। গোল্ডম্যান শ্যাক্সের এআই গ্রহণ ট্র্যাকার অনুসারে, এআই সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে এমন শিল্পগুলিতে (মার্কেটিং, গ্রাফিক ডিজাইন ও গ্রাহক সেবা) প্রতি মাসে নিট ১১,০০০ চাকরি কমছে। আগের অনুমানে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ১৬,০০০, যা কিছুটা উন্নতি হলেও এন্ট্রি-লেভেল ও হোয়াইট-কলার পদগুলিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গোল্ডম্যান শ্যাক্সের সিনিয়র বৈশ্বিক অর্থনীতিবিদ জোসেফ ব্রিগস সম্প্রতি হিসাব করেছেন, আগামী এক দশকে এআই বিস্তারের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমশক্তির প্রায় ৯ শতাংশ (প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষ) তাদের চাকরি থেকে সরে যেতে পারেন। এই শঙ্কার মেঘ যোগ করছে এআই নেতাদের পূর্বাভাস, যদিও অনেকে সম্প্রতি তাদের বক্তব্য নরম করেছেন। অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই গত মে মাসে বলেছিলেন, এআই এক থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে এন্ট্রি-লেভেল হোয়াইট-কলার চাকরির অর্ধেক নিশ্চিহ্ন করতে পারে এবং বেকারত্ব ২০ শতাংশে পৌঁছে দিতে পারে। তবে তিনি পরে এই ভবিষ্যদ্বাণী থেকে সরে এসে বলেছেন, স্বয়ংক্রিয়তা মানুষের দায়িত্ব বাড়াতে পারে। ওপেনএআই-এর প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানও একসময় বলেছিলেন, এমনকি প্রধান নির্বাহীর চাকরিও এআই-এর হাত থেকে রেহাই পাবে না। কিন্তু তিনিও সম্প্রতি মত পরিবর্তন করে জানান, এআই-এর দ্রুত বিকাশ বিশ্বব্যাপী 'চাকরির সর্বনাশ' ডেকে আনবে না। হুয়াং তার যুক্তি সমর্থনে ব্যাখ্যা করেন, 'একজন ব্যক্তির চাকরির একটি উদ্দেশ্য থাকে এবং সেই উদ্দেশ্যের মধ্যে অনেক কাজ থাকে।' যদি কিছু কাজ স্বয়ংক্রিয় হয়ে যায়, তবুও উদ্দেশ্যটি থেকে যায়। তিনি উদাহরণ হিসেবে রেডিওলজি পেশার কথা উল্লেখ করেন। 'এআই-এর গডফাদার' জিওফ্রে হিন্টন একসময় ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, রেডিওলজিস্টদের প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ২০১০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে অনুশীলনকারী রেডিওলজিস্টের সংখ্যা প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে। একটি গবেষণায় ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে, ২০৫৫ সালের মধ্যে এই সংখ্যা আরও ২৫.৭ থেকে ৪০.৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে। হুয়াং বলেন, 'এর কারণ রোগীর ব্যাকলগ অত্যন্ত বেশি। এখন ডাক্তার ও হাসপাতাল আরও বেশি রোগী ভর্তি করতে পারছেন, যার জন্য আরও নার্স ও রেডিওলজিস্ট প্রয়োজন।' বিশেষজ্ঞরা জানান, এআই স্ক্যান পড়ার কাজ সহজ করলেও রেডিওলজিস্টদের কাজের মধ্যে অন্যান্য চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ, রোগী পর্যবেক্ষণ এবং হস্তক্ষেপমূলক পদ্ধতি সম্পাদন অন্তর্ভুক্ত। ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডার্ডেন স্কুল অফ বিজনেসের অধ্যাপক ক্রিস্টফ হার্পফার বলেন, এআই যদি স্ক্যান পড়ার কাজ নেয়, তবে রেডিওলজিস্টরা অন্যান্য কাজে মনোযোগ দেবেন। একই কথা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বলে মনে করেন হুয়াং। এমনকি এআই এজেন্ট যদি কোড লেখার কাজ স্বয়ংক্রিয় করে, তবুও কোম্পানিগুলো আরও বেশি ডেভেলপার নিয়োগ করবে আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য অর্জনের জন্য। তিনি বলেন, 'আইডিয়ার ব্যাকলগ, উচ্চাকাঙ্ক্ষার ব্যাকলগ এত বেশি যে, প্রোগ্রামিংয়ের কাজ স্বয়ংক্রিয় হলে আমরা আরও বেশি সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ করে আরও বেশি কিছু করতে পারব।' হুয়াং স্বীকার করেন, স্বয়ংক্রিয়তার সাথে কিছু যন্ত্রণা আসবে। তিনি জানুয়ারিতে বলেছিলেন, কিছু চাকরি পুরোপুরি হারিয়ে যাবে, যেমনটি অন্যান্য বড় পরিবর্তনের সময় হয়েছে। যারা এআই ব্যবহারে দক্ষ তারা অদক্ষদের চেয়ে এগিয়ে যাবে। তবে তার বড় বিশ্বাস, কোম্পানিগুলো এআই-এর উৎপাদনশীলতা লাভ ব্যবহার করে কর্মী ছাঁটাই না করে বরং তাদের উৎপাদন বাড়াবে। 'উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর এটি একটি ক্লাসিক উদাহরণ,' বলেন হুয়াং, 'বৃদ্ধি বাড়লে কর্মসংস্থানও বাড়ে।'
কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে জেনসেন হুয়াং: এআই চাকরি নয়, বরং কাজগুলোকে স্বয়ংক্রিয় করবে
এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চাকরি নয়, বরং নির্দিষ্ট কাজগুলোকে স্বয়ংক্রিয় করবে। হোয়াইট-কলার শ্রমিকদের বড় ধসের আশঙ্কাকে তিনি 'ভুল' আখ্যা দিয়ে জানান, এআই-এর কারণে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, বেকারত্ব বাড়বে না।




