দেশের কর্মসংস্থান খাতে এক দশকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪’-এর দ্বিতীয় খণ্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে অ-কৃষি অর্থনৈতিক ইউনিটগুলোতে কাজ করা মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৬ লাখ ৩২ হাজার ৬৬১ জনে। এক দশক আগে এই সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৪৫ লাখ ৮৫০ জন। ফলে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ২৫ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। তবে এই সমানুপাতিক হার সব খাতে একরকম নয়; কোনো কোনো খাতে কর্মীর সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে, আবার দেশের বৃহৎ খাত পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্যে সেই সংখ্যা উল্টো কমে গেছে।
বিবিএসের সংজ্ঞা অনুযায়ী, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্লাসিফিকেশন-২০২০-এর আলোকে কৃষির বাইরের সকল অর্থনৈতিক কার্যক্রম এই শুমারির আওতাভুক্ত। এর মধ্যে রয়েছে উৎপাদন, বাণিজ্য, পরিবহন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নির্মাণ, আর্থিক সেবা ও তথ্যপ্রযুক্তি খাত।
নিযুক্তি বিবেচনায় সবচেয়ে বড় খাত এখন উৎপাদন। ২০২৪ সালে এই খাতে মোট ৯০ লাখ ২৮ হাজার ৬৫৬ জন কর্মরত ছিলেন, যা ২০১৩ সালে ছিল ৭১ লাখ ৮৩ হাজার ৪৪৬ জন। অর্থাৎ গত এক দশকে উৎপাদন খাতে ১৮ লাখ ৪৫ হাজারের বেশি নতুন কর্মীর সমাগম ঘটেছে, শতাংশের হিসেবে যা ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ। এই খাতের পরেই অবস্থান পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্যের, কিন্তু সেখানে গতি বিপরীত। ২০১৩ সালে এই খাতে ৮৩ লাখ ৯৮ হাজার ৮১০ জন কাজ করলেও ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৮১ লাখ ৭৯ হাজার ৮০৭ জনে, অর্থাৎ প্রায় ২ লাখ ১৯ হাজার কর্মী কমেছে।
শতকরা প্রবৃদ্ধির হিসেবে সর্বোচ্চ পরিবর্তন ঘটেছে প্রশাসনিক ও সহায়ক সেবা খাতে। এক দশকে এই খাতের কর্মী সংখ্যা ১ লাখ ৫১ হাজার ৬৫৩ জন থেকে বেড়ে ৫ লাখ ৩৮ হাজার ৫১৬ জনে পৌঁছেছে, যা ২৫৫ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। নির্মাণ খাতেও চিত্র প্রায় একই; ২০১৩ সালে যেখানে কর্মী ছিলেন ৪৬ হাজার ৫৫২ জন, সেখানে ২০২৪ সালে তা বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৬২ হাজার ৬২ জন, প্রবৃদ্ধি ২৪৮ দশমিক ১ শতাংশ। শিল্প, বিনোদন ও অবকাশ খাতে ২৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ এবং বিদ্যুৎ, গ্যাস ও শীতাতপনিয়ন্ত্রণ খাতে ১৪৮ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অন্যদিকে পেশাগত, বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি সেবা খাতে এই হার ১০১ দশমিক ৮ শতাংশ।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ সেবামূলক খাতগুলোতেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা গেছে। শিক্ষা খাতে ২০১৩ সালে কর্মী ছিলেন ১৪ লাখ ৮৩ হাজার ৪৪১ জন, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ লাখ ৫৪ হাজার ৯৩০ জনে, প্রবৃদ্ধি ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশ। মানব স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা খাতে ৪ লাখ ১৮ হাজার ৫৪৮ জন থেকে বেড়ে ৭ লাখ ১১ হাজার ২৮৯ জন হয়েছে, শতাংশের হিসেবে যা ৬৯ দশমিক ৯ শতাংশ। তথ্য ও যোগাযোগ খাতেও কর্মীর সংখ্যা ১ লাখ ৬ হাজার ৩ জন থেকে বেড়ে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৯১৬ জনে উন্নীত হয়েছে, প্রবৃদ্ধি ৬৩ দশমিক ৯ শতাংশ। তবে সব খাতে যে কর্মসংস্থান বেড়েছে তা নয়; খনি ও খনিজ উত্তোলন খাতে এক দশকে কর্মী সংখ্যা ৬৪ হাজার ৪৪৪ জন থেকে কমে মাত্র ১৭ হাজার ৪২৬ জনে দাঁড়িয়েছে, যা ৭৩ শতাংশ পতন। অন্যান্য সেবা খাতে ২১ লাখ ৯৩ হাজার ১৮৪ জন থেকে বেড়ে ২৬ লাখ ৩ হাজার ৮০১ জন এবং আবাসন খাতে ৪৩ হাজার ২৯৬ জন থেকে বেড়ে ৫২ হাজার ৩৯৯ জন কর্মী নিযুক্ত হয়েছেন।
বিবিএসের এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয় যে, কর্মসংস্থানের কাঠামো এখন উৎপাদনমুখী ও সেবানির্ভর হচ্ছে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর অধ্যাপক মো. রিদওয়ানুল হক মনে করেন, এই প্রবৃদ্ধির তথ্য নিয়ে আরও বিশ্লেষণ দরকার। তিনি বলেন, এক দশকে ২৫ শতাংশ জনবল বৃদ্ধি সম্ভব, তবে বিবিএসের জরিপ পদ্ধতি যাচাই করা জরুরি। প্রশাসনিক খাতে চাহিদা অনুযায়ী নিয়োগ হয়েছে কি না এবং পেশাগত খাতে দক্ষতা বৃদ্ধি সমাজে প্রকৃত অবদান রাখছে কি না—এই প্রশ্নগুলো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা প্রয়োজন। খনি খাতে কর্মী কমার কারণ হিসেবে তিনি দেশে খনিজ উত্তোলন কার্যক্রম হ্রাস এবং দক্ষ জনবলের অভাবে এই শিল্পে বিদেশমুখীতা না বাড়াকে দায়ী করেছেন।




