শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলায় পদ্মা নদীর নির্মাণাধীন তীর রক্ষা বাঁধের তিনটি স্থানে হঠাৎ ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত এক সপ্তাহে নদীর পানি ও স্রোতের তীব্রতা বাড়ায় বাঁধের অন্তত ২০০ মিটার অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে ২৫টি পরিবার তাদের বসতবাড়ি সরিয়ে নিয়েছে, অপরদিকে ভাঙনের কবলে রয়েছে আরও প্রায় ৩০০টি পরিবারের ঘরবাড়ি।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, পদ্মা সেতু এলাকার নাওডোবা থেকে জাজিরা ইউনিয়নের পাথালিয়াকান্দি পর্যন্ত পদ্মার দক্ষিণ তীরে ১০ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এই তীর রক্ষা বাঁধ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। মোট ৩৯টি প্যাকেজে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ১৩০ কোটি টাকা। উপজেলার পালেরচর ইউনিয়নের কাথুরিয়া, ফরাজী কান্দি এবং নাওডোবা ইউনিয়নের পৈলান মোল্যারকান্দি ও আলম খার কান্দি এলাকায় ভাঙনের ফলে সাতটি দোকান ও গ্রামীণ সড়কের প্রায় ৫০ মিটার অংশ নদীতে ধসে গেছে।

২০২৪ সালের মার্চ মাসে পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের জিরো পয়েন্ট থেকে পাথালিয়াকান্দি পর্যন্ত ৮ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার এলাকায় বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল। পরে ২০২৫ সালে পদ্মা সেতু প্রকল্পের তীর রক্ষা বাঁধের একটি অংশে ভাঙন দেখা দিলে এর সঙ্গে আরও দুই কিলোমিটার অংশ যুক্ত করা হয়। বর্তমানে বাঁধের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার অংশের ৬০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ৫ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার অংশে নদীতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছিল, তবে বর্ষা মৌসুমের কারণে এখন সেই কাজ বন্ধ রয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত ব্লক তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

ভাঙনের কবলে পড়া জাজিরার কাথুরিয়া গ্রামের ৫৫ বছর বয়সী রাহিমা বেগম জানান, ১৮ বছর আগে তাঁর স্বামী মারা যান। দুই সন্তান নিয়ে তিনি বাবার বাড়িতে থাকতেন। চার শতক জমির ওপর গড়ে ওঠা সেই বাড়িটিই গত সোমবার পদ্মায় বিলীন হয়ে যায়। বাড়ির মালামাল সরানোর সময় তিনি আহাজারি করে বলেন, পরিবারে আয় করার মতো কেউ নেই। তিনি ঢাকায় হকারি করে কাপড় বিক্রি করেন। এখন বাড়ি ভেঙে যাওয়ায় এলাকায় চলে এসেছেন।

কাথুরিয়া এলাকায় জ্বালানি তেল, রান্নার জন্য তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলপিজি) ও মুদিখানার পণ্য বিক্রি করতেন রেজাউল করিম। গত রোববার রাতে মালামালসহ তাঁর দোকান নদীতে তলিয়ে যায়। তিনি বলেন, তিন বছর ধরে বাঁধের কাজ চলছে, কিন্তু ভাঙন থামছে না। চোখের সামনে সর্বস্ব হারিয়ে তিনি নিঃস্ব হয়ে গেছেন, এখন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন তা বুঝে উঠতে পারছেন না।

গত মঙ্গল ও সোমবার দুই দিনে কাথুরিয়া-মাঝিরঘাট সড়কের প্রায় ৫০ মিটার অংশ নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ায় ওই সড়ক দিয়ে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ভ্যান ও মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। গত সোমবার কাথুরিয়া গ্রামে সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইনের তিনটি খুঁটি তারসহ নদীতে পড়ে গেছে, ফলে এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। আতঙ্কে গ্রামবাসী ঘরবাড়ি ও দোকানের মালামাল সরিয়ে নিচ্ছেন। কেউ কেউ বাড়ির গাছপালা কেটে সরিয়ে ফেলছেন।

ভাঙনের খবর পেয়ে পাউবোর তিনজন কর্মকর্তা কাথুরিয়া এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, হঠাৎ করেই ভাঙন শুরু হয়েছে এবং বাঁধের পাশে প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকা এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ভাঙন ঠেকাতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে।

কাথুরিয়া গ্রামের ৬৫ বছর বয়সী নাজমা বেগম গত ২০ বছরে ছয় দফায় নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন। ভাঙনে তাঁর ১০ বিঘা ফসলি জমি ও বসতবাড়ি বিলীন হয়ে গেছে। এবার তাঁর শেষ সম্বল ২০ শতক জমির ওপর থাকা বসতবাড়িটিও ভাঙনের কবলে পড়েছে। তিনি বলেন, মধ্যবিত্ত কৃষি পরিবার ছিল তাদের, নদীভাঙনে নিঃস্ব হয়ে গেছেন। শেষ আশ্রয়ের বাড়িটিও বিলীন হয়ে যাচ্ছে, সন্তান ও অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে কোথায় যাবেন বুঝতে পারছেন না।

এ বিষয়ে পাউবোর শরীয়তপুর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী খান মোহাম্মদ ওয়ালিউজ্জামান বলেন, প্রকল্পের কাজ চলাকালে গত বছর কয়েকটি এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছিল। এ কারণে ওই অংশের নকশা পরিবর্তন করা হয়। নকশা অনুমোদনের পর বর্ষার আগেই সেখানে আবার কাজ শুরু করা হয়েছিল, তবে এর মধ্যেই নতুন করে ভাঙন শুরু হয়েছে।