মোহাম্মদ নূরুজ্জামানের ‘মাস্তুল’ চলচ্চিত্রটি নিছক একটি জাহাজের গল্প নয়; বরং এটি নদী ও মানুষের সাংস্কৃতিক স্মৃতির এক নীরব প্রতিধ্বনি। চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় দৃশ্যে দেখা যায়, একটি তেলবাহী ট্যাংকারের বৃদ্ধ পাচক মকবুল ক্রু সদস্যদের প্রত্যেকের নামে একে একে নদীতে কয়েন নিক্ষেপ করছেন। এই আপাতসাধারণ দৃশ্যটি হাজার বছরের মানব ইতিহাসের এক গভীর প্রত্নতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটকে ধারণ করে। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, ব্রোঞ্জ যুগ থেকেই ইউরোপের নদী ও জলাভূমিতে অস্ত্র, অলংকার ও মূল্যবান বস্তু সচেতনভাবে নিবেদন করা হতো। গ্রিক সভ্যতায় ঝরনা ও নদীকে দেবতার আবাস হিসেবে বিবেচনা করে সেখানে ধাতব নিবেদন দেওয়ার রীতি চালু হয়। রোমানরা এই প্রথাকে আরও বিস্তৃত করে এবং ট্রেভি ফাউন্টেনের মতো জায়গায় কয়েন নিক্ষেপের আধুনিক রীতির সূচনা হয়। ভারতীয় উপমহাদেশে গঙ্গা, যমুনা ও নর্মদার মতো নদীতে মুদ্রা অর্পণের রীতি ধর্মীয় বিশ্বাস ও লোকসংস্কৃতির মিশ্রণ। বৌদ্ধ সমাজেও একই ধরনের আচার দেখা যায়, যদিও বুদ্ধের মূল শিক্ষায় এর কোনো নির্দেশ নেই। চলচ্চিত্রটি এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে সরাসরি ব্যাখ্যা না করে, তার শিল্পের মাধ্যমেই দর্শকের মনে অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। মকবুল চরিত্রটি এখানে নিছক একজন পাচক নন; তিনি বৌদ্ধ দর্শনের করুণা ও মেত্তার (সর্বজনীন মৈত্রী) মূর্ত প্রতীক। তার নীরবতা ও সংযম প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের মানবিকতা অক্ষুণ্ন রাখার এক নৈতিক অবস্থান। অন্যদিকে নূরা, বন্দরের এক পথশিশু, যে মকবুলের কাছ থেকে সম্পদ নয়, বরং মানুষের প্রতি শুভবোধের উত্তরাধিকার গ্রহণ করে। জাহাজ যখন অন্যায়ভাবে নূরাকে তীরে ফেলে চলে যায়, তখন সে মকবুলের দেওয়া কাপড়ের পুঁটলি থেকে কয়েন বের করে একে একে নদীতে নিক্ষেপ করে—যারা তাকে ফেলে গেছে, তাদের জন্যও। এই দৃশ্যই চলচ্চিত্রটির নৈতিক কেন্দ্রবিন্দু। নির্মাতা নূরুজ্জামানের ক্যামেরা নদীকে কখনো দর্শনীয় পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করে না; বরং সংকীর্ণ করিডর, ইঞ্জিনরুম ও ডেকের সীমিত পরিসরের মাধ্যমে মানুষের আবদ্ধতা ও অস্তিত্বগত শূন্যতা ফুটিয়ে তোলে। আবদুল্লাহ রাকিবের কালার গ্রেডিং নদীর ধূসরতা ও মরিচা ধরা লোহার বিবর্ণ আলোয় এক বাস্তবসম্মত জগৎ তৈরি করে। শব্দের ব্যবহারেও একই সংযম দেখা যায়—ইঞ্জিনের গর্জন, ঢেউয়ের শব্দ, দূরের হর্ন ও বন্দরের কোলাহল মিলিয়ে সংলাপের চেয়েও পরিবেশ বেশি অর্থ বহন করে। ফজলুর রহমান বাবুর সংলাপহীন অভিনয় এই নীরব চলচ্চিত্রভাষার সঙ্গে অসাধারণভাবে মিশে গেছে, যদিও সুকানি চরিত্রে দীপক সুমনের অভিনয় তুলনামূলকভাবে বেশি থিয়েট্রিক্যাল মনে হতে পারে। চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্যে ক্যামেরা নদীর জলের নিচে নেমে যায়, যেখানে কয়েনগুলো তলিয়ে যেতে থাকে। কোনো অলৌকিক ঘটনা ঘটে না, তবু এই দৃশ্যটি বাস্তবতার সীমানা ছাড়িয়ে এক অন্তর্মুখী অনুভূতি তৈরি করে। নদীর তলায় ডুবে যাওয়া কয়েনগুলো তখন আর ধাতব মুদ্রা থাকে না; তারা হয়ে ওঠে মানুষের নৈতিক স্মৃতির দৃশ্যমান রূপ। ‘মাস্তুল’ শেষ পর্যন্ত প্রমাণ করে, মানুষের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার সম্পদ নয়, বরং অন্যের মঙ্গল কামনা করার ক্ষমতা।