প্রায় আড়াই দশক আগে মুক্তি পাওয়া মান্না অভিনীত ‘রংবাজ বাদশা’ সিনেমাটি কেন আরেক নায়ক জসিমকে উৎসর্গ করা হয়েছিল, সেই রহস্য উন্মোচন করেছেন পরিচালক মনতাজুর রহমান আকবর। সিনেমাটির ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি জানান, জসিমের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

নব্বই দশকের শুরুর দিকে ঢালিউডে তুমুল আলোচিত নাম ছিল জসিম। অন্যদিকে তরুণ নির্মাতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছিলেন মনতাজুর রহমান আকবর। তাঁর পরিচালিত অ্যাকশন সিনেমাগুলো ভালো ব্যবসা করছিল এবং আকবর-মান্না জুটি হিট তকমা পেতে শুরু করেছিল। ১৯৯৮ সালে মারা যান জসিম। ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে ও মান্নার ক্যারিয়ারের শুরুতে দুজনের অ্যাকশন সিনেমা নিয়েই বেশি আলোচনা হতো। অনেকে তাদের তুলনা করতেন।

পরিচালক জানান, জসিম ও মান্না কখনোই একে অপরকে প্রতিযোগী হিসেবে দেখেননি। মান্না তখন মাত্র কয়েকটি সিনেমা দিয়ে নিজের জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করছিলেন, অন্যদিকে জসিম ইতোমধ্যেই সুপারস্টার। মনতাজুর রহমান বলেন, জসিম তাঁর কাজ দেখে সাগরেদদের মাধ্যমেই তাঁকে চিনতেন। ‘জসিম ভাই তখন আলোচিত নাম। তিনি ছিলেন আমাদের অনেক সিনিয়র। আমাকে “তুমি” বলে সম্বোধন করতেন। মূলত আমার সিনেমা দেখেই প্রথম পরিচয়,’ বলেন তিনি।

এফডিসিতে দেখা হলেই স্নেহের সুরে আকবরকে ডেকে পাশে বসাতেন জসিম। সিনেমা নিয়েই হতো তাদের কথা। পরিচালক স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘জসিম ভাই তো শুটিং নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। আর আমি তখন নতুন। তাঁর সঙ্গে কথা বলার মতো অতটা সাহস হতো না। হঠাৎ একদিন শুটিংয়ের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি, এমন সময় জসিম ভাই ডেকে পাশে বসালেন। হেসে বললেন, “তুমি তো মান্নাকে নিয়ে আমার প্যাটানের ছবি বানাচ্ছ। আমাকে নিয়ে ট্রাই করো। আমাকে নিয়ে অ্যাকশন সিনেমা বানাও।” মজা করে কথাগুলো বলছিলেন। তখন জসিম ভাইয়ের শিডিউল পাওয়া অনেক বড় বিষয় ছিল। আমি তো সারপ্রাইজড হলাম।’

জসিমের গুণগান করে মনতাজুর রহমান আকবর বলেন, ‘জসিম ভাই অনেক গুণী, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। তারপরেও তিনি জুনিয়রদের সম্মান দিতেন। অনেক উৎসাহ দিতেন। এটাও কিন্তু আমাদের এগিয়ে যাওয়ার একটি অনুপ্রেরণা ছিল। পরবর্তীতে আমাদের নির্মাতারা এই সহযোগিতা পায় নাই।’ নিয়মিত সিনেমা বানালেও জসিমের সঙ্গে কাজ করা হয়ে ওঠেনি আকবরের। একদিন আড্ডায় জসিম আকবরকে বলেন, ‘আমার গল্পগুলো তুমি বলছ। কিন্তু আমি কাজ করতে পারছি না। আমার অনেক আফসোস হচ্ছে। ইচ্ছা থাকলেও কেন যেন হয়ে উঠছে না।’

এরপর তারা একসঙ্গে সিনেমা করার পরিকল্পনা করেন। সেই সিনেমার নাম ছিল ‘বশিরা’। গল্প শুনে জসিম বলেন, ‘এটা আমার গল্প। আমার জন্য লেখা, এই গল্প আমি করতে চাই।’ কিন্তু শেষ মুহূর্তে কাস্টিং করা হয় মান্নাকে। এতে কারো কোনো মান–অভিমান ছিল না। মনতাজুর রহমান আকবরের ‘শান্ত কেন মাস্তান’ সিনেমাটি ব্যবসায়িক সফলতা পায়। সেই সময় এফডিসির ৪ নম্বর ফ্লোরে শুটিং করছিলেন জসিম। তিনি দূর থেকে ডেকে আকবরকে বলেন, ‘তুমি তো হিট। ঢালিউডের হিট ডিরেক্টর। তোমার “শান্ত কেন মাস্তান” সিনেমাটি রিলিজের দিনই গুলিস্তানে দেখেছি। “শান্ত কেন মাস্তানের অ্যাকশন দেখে মনে হচ্ছিল, আমি জসিম নিজেই অভিনয় করছি।”’ পরিচালক জানান, ‘তখন আমাদের সম্পর্কটা বেশ ভালো। পরিকল্পনায় ছিল জসিম ভাইকে নিয়ে বড় বাজেটে ভালো কাজ করব। ভাইয়ের কাছে দোয়া চাইলাম। দুর্ভাগ্য, সে বছরই তিনি মারা গেলেন।’

শুটিংয়ের সময় ঠান্ডা ও শ্বাসকষ্ট থেকে মারা যান জসিম। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও জসিমের সঙ্গে কোনো কাজ না হওয়ার আফসোস ছিল পরিচালকের। ‘এই ঘটনাটি আমাকে বেশ কষ্ট দিত। পরবর্তীতে আমি ও প্রযোজক আমান একসঙ্গে মান্নাকে নিয়ে “রংবাজ বাদশা” সিনেমাটি শুরু করি। সিনেমাটির পরিকল্পনা থেকে শুটিং পর্যন্ত বেশির ভাগ সময় জসিম ভাই ছায়ার মতো ছিলেন। আমান ভাইয়ের বন্ধু ছিলেন জসিম ভাই। তিনিও প্রিয় মানুষকে হারিয়ে অসহায় বোধ করেছিলেন।’ দুজনেই চেয়েছিলেন জসিমকে কৃতজ্ঞতা জানাতে। সেই সুযোগ হিসেবে বেছে নেন ‘রংবাজ বাদশা’ সিনেমাটি। মনতাজুর রহমান বলেন, ‘জসিম ভাইয়ের প্রতি আমার ও আমান ভাইয়ের শ্রদ্ধা থেকে সিনেমাটি তাঁকে উৎসর্গ করি। জসিম ভাইয়ের প্রতি এমন ভালোবাসা জানিয়ে আমরা কৃতজ্ঞ ছিলাম। সেই সময় তাঁর চলে যাওয়াটা সিনেমার জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছিল।’

২০০১ সালে দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়া ‘রংবাজ বাদশা’ দর্শকদের মধ্যে আলোচিত হয়। সাধারণ এক প্রতিবাদী বাদশার রংবাজ হয়ে ওঠার গল্প এটি। ২৫ বছর আগের স্মৃতি স্মরণ করে পরিচালক বলেন, ‘সেই সময় সিনেমার শুরুতে জসিমের প্রতি উৎসর্গ করায় ভক্তরা প্রশংসা করেছিলেন। জসিমকে উৎসর্গ করায় মান্নাও বেশ খুশি হয়েছিল।’