সাম্প্রতিক সপ্তাহে জর্জিয়ার ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর জন অসফ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে দেওয়া একটি ভাইরাল বক্তব্যে সরাসরি নাটালি হার্পের নাম উল্লেখ করেন। সিনেটরটি ইঙ্গিত দেন যে, কাতারের আমিরের উপহার দেওয়া উড়োজাহাজে ট্রাম্প নাটালির সঙ্গে ভ্রমণ করেন। বিশেষ করে গত জুলাইয়ে ইরানের হুমকির মুখে প্রেসিডেন্ট যখন গোপনে তুরস্ক ছাড়েন, তখন ছোট সহযোগী দলের সঙ্গে নাটালির উপস্থিতির দিকেই তিনি নজর দেন। এই মন্তব্য হোয়াইট হাউসে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। প্রশাসনের ঘনিষ্ঠরা অসফকে ‘লজ্জাজনক ও সস্তা নাটুকে ছেলে’ এবং ‘দুর্বল হেরে যাওয়া ব্যক্তি’ হিসেবে অভিহিত করেন। অনলাইনে বক্তব্যটি ব্যাপক মনোযোগও পায়।

এই বিতর্কের মধ্যেই সামনে আসে ২০২৩ সালের অক্টোবরের একটি ঘটনা। নিউইয়র্ক নগরের আদালতে ট্রাম্পের মামলা লড়ার দিন তাঁর গাড়িবহর ট্রাম্প টাওয়ারের বাইরে অপেক্ষা করছিল। কিন্তু গাড়িতে নাটালি হার্পের জন্য কোনো আসন ছিল না। তত দিনে তিনি ট্রাম্পের প্রতি চরম আনুগত্য দেখিয়ে তাঁর ঘনিষ্ঠ বলয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন। সিএনএনের কাছে বর্ণনা দেওয়া দুটি সূত্র জানায়, লবিতে তুমুল চিৎকার ও তর্ক শুরু হয়। নাটালি দাবি করেন, ট্রাম্প নিজেই তাঁকে শুনানিতে উপস্থিত থাকতে বলেছেন। একটি ছবিতেও ঘটনার সত্যতা মেলে। আসন না পেয়েও পিছু হটেননি তিনি; বরং গাড়িবহরের একটি এসইউভির পেছনের ট্রাঙ্কে লাফিয়ে উঠে পড়েন, যেখানে সাধারণত লাগেজ রাখা হয়। এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসেনি আগে, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ট্রাম্পের পাশে তাঁর সার্বক্ষণিক ও অত্যন্ত নিবেদিতপ্রাণ ভূমিকার স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে।

ডানপন্থী টিভি চ্যানেলের সাবেক উপস্থাপিকা হিসেবে পরিচিত হার্প ২০২২ সালে ট্রাম্পের কর্মী বাহিনীতে যোগ দেন। প্রেসিডেন্টকে নিজের জীবন বাঁচানোর কৃতিত্ব দেওয়ার পর থেকেই তিনি তাঁর সঙ্গে কাজ শুরু করেন। এরপর থেকে তিনি প্রেসিডেন্ট ও বাইরের বিশ্বের মধ্যকার মূল সংযোগকারী মাধ্যমে পরিণত হন। মিত্রদের বার্তা পৌঁছে দেওয়া, বৈঠকের ব্যবস্থা করা, ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট লেখা এবং প্রশংসাসূচক নিবন্ধের প্রিন্টআউট বহন—সবই তাঁর কাজের অংশ। দিনের প্রতিটি মুহূর্তে তিনি ট্রাম্পের কাছাকাছি থাকেন।

হোয়াইট হাউসের এক উপদেষ্টা সিএনএনকে জানান, ট্রাম্প নাটালির এই মনোযোগ পছন্দ করেন। শতভাগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ও অনুগত—এই বৈশিষ্ট্যও প্রেসিডেন্টের পছন্দ। তিনি কোনো দ্বিধা করেন না, কোনো প্রশ্ন তোলেন না। পুনর্নির্বাচনী প্রচারে আনুষ্ঠানিক কোনো পদবি না থাকা সত্ত্বেও হার্প সারা দেশে ট্রাম্পের পেছনে পেছনে ছিলেন। ইতিবাচক খবর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট ও অন্যান্য চিঠিপত্র এত ঘন ঘন দিতেন যে মিত্ররা তাঁর নাম দিয়েছিলেন ‘মানব প্রিন্টার’।

এক রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা উল্লেখ করেন, মাঝেমধ্যে সরাসরি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তাঁরা সব সময় খেয়াল রাখেন যেন নাটালি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত থাকেন। ওই আইনপ্রণেতা বলেন, ‘তিনি সব সময় উত্তর দেন। তিনি কীভাবে সবকিছু সামলান আমি জানি না।’ তিনি আরও যোগ করেন, ট্রাম্পকে বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি নাটালি প্রায়ই নিজে থেকে প্রেসিডেন্টের পক্ষে আইনপ্রণেতাদের বিভিন্ন নিবন্ধ বা নোট পাঠান।

ওভাল অফিসে বিভিন্ন চুক্তি স্বাক্ষর ও অনুষ্ঠানের ভিডিও পর্যালোচনায় সিএনএন দেখেছে, ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে বা প্রেসিডেন্টের কথা শুনে সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়তে দেখা যায় হার্পকে। জনসভায়ও প্রায়ই তিনি ট্রাম্পের পাশের ছোট কর্মীদলের মধ্যে থাকেন। কোনো কিছু খুঁজে বের করতে বা প্রিন্ট করতে দেওয়ার পর ট্রাম্প অনেক সময় অবাক হয়ে মন্তব্য করেন, ‘নাটালি বড্ড দ্রুত কাজ করেন।’

তবে সব জায়গায় তাঁর এই উপস্থিতি মাঝে মাঝে হোয়াইট হাউসের ভেতরে অন্যদের মনে অসন্তোষ সৃষ্টি করে। বিশেষ করে কিছু উপদেষ্টার জন্য এটি সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়, যাঁরা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে একান্তে বৈঠক করতে চান কিন্তু গিয়ে দেখেন সেখানে নাটালিও বসে আছেন। একটি সূত্র এই পরিস্থিতি নিশ্চিত করেছে। অন্য একটি সূত্র জানায়, ৩৫ বছর বয়সী এই নারী ট্রাম্পকে নিয়ে বেশ সচেতন। অন্যদের তিনি বলেন, তিনি কেবল ট্রাম্পের কাছেই জবাবদিহি করেন। এমন বক্তব্য প্রশাসনিক ধারায় কাজ করা অন্য কর্মীদের বিরক্ত করে।

অন্যদিকে, হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা এসব অভিযোগ হালকাভাবে নিয়ে দাবি করেন, নাটালি অধিকাংশ সহকর্মীর সঙ্গেই ভালোভাবে কাজ করেন এবং প্রাসঙ্গিক তথ্য সঠিক ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেন। গত মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে মুখপাত্র ডেভিস ইঙ্গল তাঁর পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেন, তিনি ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দলের অন্যতম অনুগত ও কঠোর পরিশ্রমী সহকারী’।

ট্রাম্প ও নাটালির সম্পর্ক নিয়ে জানেন এমন এক ব্যক্তি দাবি করেন, তাঁদের সম্পর্ক মূলত ‘বাবা-মেয়ের’ মতো। ওয়েস্ট উইংয়ে হার্পের অস্বাভাবিক প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক থাকা ব্যক্তিরাও বুঝতে পারছেন না—এই নতুন বিতর্কের পর তাঁর অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসবে কি না, বিশেষ করে ট্রাম্পের কাছে তাঁর গুরুত্ব কমবে কি না।

এছাড়াও, চলতি বছরের শুরুর দিকে ট্রাম্প একটি বর্ণবাদী ভিডিও পোস্ট করে তীব্র বিতর্কের মুখে পড়েন। ভিডিওতে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও সাবেক ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামাকে জঙ্গলের বানর হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়। গভীর রাতের ওই পোস্টটি রাজনৈতিক অঙ্গনে সমালোচনার মুখে পড়ে। পরে ভিডিওটি মুছে ফেলা হয়। এই ঘটনায় ট্রাম্প ও তাঁর সহযোগীরা আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েন।