জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল লি জুনহুয়া, ইউএন-এসক্যাপের নির্বাহী সচিব আর্মিদা সালসিয়াহ আলিসজাহবানা এবং ইউএনডিপির এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় ব্যুরোর আঞ্চলিক পরিচালক কান্নি উইগ্নারাজার সঙ্গে পৃথক বৈঠকে এই অনুরোধ জানান প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এসব সাক্ষাতে তিনি বাংলাদেশের টেকসই ও নির্বিঘ্ন এলডিসি উত্তরণ, এসডিজি বাস্তবায়ন ত্বরান্বিতকরণ এবং সরকারের সংস্কার কর্মসূচির জন্য জাতিসংঘের জোরালো সমর্থন কামনা করেন।

লি জুনহুয়ার সঙ্গে বৈঠকে উপদেষ্টা বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়ানোর আবেদনের বিষয়টি বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, সুষ্ঠু উত্তরণ কৌশল (স্মুথ ট্রানজিশন ট্র্যাজেডি) কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন এবং টেকসই ও অপরিবর্তনীয় উত্তরণ নিশ্চিত করতেই এই সময় বৃদ্ধির অনুরোধ জানানো হয়েছে। জবাবে লি জুনহুয়া বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় ইউএন ডেসারের অব্যাহত সহযোগিতার আশ্বাস পুনর্ব্যক্ত করেন এবং এলডিসি উত্তরণপ্রক্রিয়া সফল ও টেকসই করতে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

আর্মিদা সালসিয়াহ আলিসজাহবানার সঙ্গে বৈঠকে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর উল্লেখ করেন যে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে প্রাপ্ত গণরায় সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, জবাবদিহিমূলক সুশাসন এবং জনকল্যাণমুখী উন্নয়ন কর্মসূচিকে এগিয়ে নেওয়ার ভিত্তি আরও সুদৃঢ় করেছে।

এর আগে সোমবার জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে এলডিসি গ্রুপের পক্ষে বক্তব্য দেন উপদেষ্টা। ইকোসকের প্রেসিডেন্ট লোক বাহাদুর থাপার সভাপতিত্বে ওই অধিবেশনে তিনি বলেন, নজিরবিহীন রাজনৈতিক, সামষ্টিক অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও বৈশ্বিক অভিঘাতের কারণে বাংলাদেশ ও নেপাল এলডিসি থেকে উত্তরণের সময় আরও তিন বছর, অর্থাৎ ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর আবেদন জানিয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে জটিল অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে উত্তরণের পথে থাকা দেশগুলোর জন্য অতিরিক্ত এই সময় কোনো বিলাসিতা নয়; বরং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, সুষ্ঠু উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়ন এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার জোরদারের জন্য কৌশলগত কারণে এটি অপরিহার্য।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ইকোসক অধিবেশনে এলডিসি গ্রুপের পক্ষ থেকে পাঁচটি অগ্রাধিকার তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ক্রমবর্ধমান ঋণঝুঁকি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত, পূর্বানুমানযোগ্য ও স্বল্প সুদে ঋণসহ অনুকূল অর্থায়ন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, উৎপাদন সক্ষমতা, সহনশীল অবকাঠামো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক সুরক্ষা এবং মৌলিক সেবায় বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, স্বল্পোন্নত দেশগুলোর কাঠামোগত দুর্বলতাকে বিবেচনায় এনে আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোর সংস্কার করতে হবে। এ জন্য অনুকূল অর্থায়নে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি, ঋণ পরিশোধে স্থগিতাদেশ, টেকসই ঋণ সমাধান এবং আরও ন্যায্য অর্থায়নব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। সুরক্ষাবাদী প্রবণতা থেকে সরে এসে এলডিসিগুলোর জন্য বাজার প্রবেশাধিকার সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণের ওপরও জোর দেন তিনি। উপদেষ্টা উল্লেখ করেন যে প্রযুক্তি হস্তান্তর, সক্ষমতা উন্নয়ন এবং ডিজিটাল রূপান্তরে সহযোগিতা বাড়িয়ে ডিজিটাল ও প্রযুক্তিগত বৈষম্য দূর করতে হবে, যাতে স্বল্পোন্নত দেশগুলো উদ্ভাবনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে টেকসই উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে পারে।