বাংলাদেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব ও পরিচয়কে অস্বীকার করে সম্প্রতি দেওয়া দুই মন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহার কিংবা স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছে দুটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশন (সিএইচটিসি) এবং ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্ক গ্রুপ ফর ইন্ডিজেনাস অ্যাফেয়ার্স (আইডব্লিউজিআইএ) যৌথ বিবৃতিতে এই আহ্বান জানিয়েছে।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ওই বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ১১ আগস্ট ঢাকায় ‘বাংলাদেশের জন্য আদিবাসী পরিচয় অপ্রাসঙ্গিক’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এ ধরনের মন্তব্য করেন। ওই অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী জনগোষ্ঠী নেই এবং প্রত্যেক নাগরিককে শুধু বাংলাদেশি হিসেবে পরিচয় দেওয়া উচিত। অন্যদিকে তথ্যমন্ত্রীও ‘আদিবাসী’ শব্দটির ব্যবহারকে অপ্রাসঙ্গিক বলে অভিহিত করেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম গবেষণা ফাউন্ডেশন (সিএইচআরএফ) ওই আলোচনার আয়োজন করেছিল।

বিবৃতিতে সংস্থা দুটি জানায়, আদিবাসী হিসেবে পরিচয় এবং বাংলাদেশের নাগরিক হওয়া—এই দুটি বিষয় একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। বাংলাদেশের আদিবাসীরা যেমন রাষ্ট্রের নাগরিক, তেমনি তারা স্বতন্ত্র আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সদস্য। এই পরিচয়ের স্বীকৃতি জাতীয় ঐক্য, সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা বা আঞ্চলিক অখণ্ডতার জন্য কোনো হুমকি নয় বলে তারা মনে করে।

সংগঠন দুটি আরও স্মরণ করিয়ে দেয়, বাংলাদেশ আইএলও কনভেনশন ১৬৯ অনুসমর্থন না করলেও ১৯৫৭ সালের আদিবাসী ও ট্রাইবাল জনগোষ্ঠীবিষয়ক আইএলও কনভেনশন ১০৭ অনুসমর্থন করেছে। ফলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পরিচয়, সংস্কৃতি, প্রতিষ্ঠান এবং ঐতিহ্যগত ভূমির অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশের আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাদের ভাষ্য, আদিবাসী পরিচয় অস্বীকার করা বাংলাদেশের সংবিধান, আইন ও নীতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সংবিধানের ২৩ক অনুচ্ছেদে স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যসম্পন্ন জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব স্বীকার করা হয়েছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন আইন ও নীতিতেও আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের কথা উল্লেখ রয়েছে।

১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে ওই অঞ্চলকে ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী-অধ্যুষিত বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন এলাকা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। সংস্থা দুটির মতে, আদিবাসী পরিচয় অস্বীকার করার প্রবণতা অব্যাহত থাকলে পার্বত্য চুক্তির চেতনা এবং শান্তিপ্রক্রিয়ার ওপর মানুষের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে।

বিবৃতিতে আদিবাসী প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপ, আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন এবং পার্বত্য চুক্তি পুরোপুরি কার্যকরের জন্য সময়সীমাবদ্ধ রূপরেখা গ্রহণেরও দাবি জানানো হয়েছে। শেষে তারা পর্যবেক্ষণ দেয়, আদিবাসীদের স্বীকৃতি দিলে বাংলাদেশ বিভক্ত হবে না; বরং তাদের পরিচয় অস্বীকার, বৈষম্য ও দমনই বিভাজন তৈরি করতে পারে।