বৈশ্বিক তেলবাজারের ইতিহাস বলছে, দাম কখনোই স্থিতিশীল ছিল না। ১৯৭০-এর দশকের শুরুর দিকে ইয়ম কিপ্পুর যুদ্ধের সময় মধ্যপ্রাচ্য রপ্তানি কমিয়ে দেওয়ায় প্রথম বড় তেল সংকট দেখা দেয়। ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি চাহিদা হ্রাস এবং অ-ওপেক উৎপাদকদের প্রবেশের ফলে দাম কমে যায়। ২০০৮ সালে বিশ্বব্যাপী চাহিদা বেড়ে দাম আবার চূড়ায় ওঠে, কিন্তু বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের কারণে তা ধসে পড়ে। ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারির লকডাউনের ফলে তেলের চাহিদা অভূতপূর্বভাবে কমে ব্যারেলপ্রতি দাম ২০ ডলারের নিচে নেমে আসে। এই অস্থিরতার মধ্যেই ৯ জুলাই, ২০২৬-এ ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৯.২৫ ডলারে। এদিন পূর্বাঞ্চলীয় সময় সকাল ৮টা ৫ মিনিটে এই দাম রেকর্ড করা হয়, যা আগের দিনের তুলনায় ১ দশমিক ৩৮ শতাংশ বেশি। এক মাস আগে দাম ছিল ৯৬.৪১ ডলার, অর্থাৎ বর্তমান দাম ১৭ দশমিক ৭৯ শতাংশ কম। তবে এক বছর আগের তুলনায় দাম ১১ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেশি, কারণ তখন তা ছিল ৭০.৯৮ ডলার।
তেলের দাম বাড়লে পাম্পে জ্বালানির মূল্য খুব দ্রুত বেড়ে যায়, কিন্তু কমলে তা ধীরে ধীরে প্রতিফলিত হয়। এই ঘটনা ‘রকেটস অ্যান্ড ফেদারস’ প্রভাব নামে পরিচিত। অপরিশোধিত তেল পাম্পের মূল্যের অর্ধেকেরও বেশি অংশ দখল করে, বাকি অংশ আসে শোধন, পাইকারি, সরকারি কর ও পেট্রোল পাম্পের মার্জিন থেকে। জরুরি অবস্থা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ’ ভূমিকা রাখে। নিষেধাজ্ঞা, ঘূর্ণিঝড় বা যুদ্ধের সময় সরবরাহ ব্যাহত হলে এই রিজার্ভ থেকে তেল সরবরাহ করে দামের ধাক্কা কমানো হয়। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়, বরং স্বল্পমেয়াদি নিরাপত্তা বলয় হিসেবে কাজ করে।
তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজার পরস্পর সম্পর্কিত। তেলের দাম বেড়ে গেলে অনেক শিল্প সম্ভব হলে প্রাকৃতিক গ্যাসের দিকে ঝোঁকে, যার ফলে গ্যাসের চাহিদা ও দামও বাড়তে পারে। অন্যদিকে নতুন জ্বালানি সরবরাহের উৎস হিসেবে শেল তেলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রে যত বেশি শেল তেল উত্তোলন সম্ভব হবে, সরবরাহ তত বেশি নিশ্চিত হবে এবং দাম বৃদ্ধির প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে থাকবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে তেলের দাম নির্ভর করে ভূরাজনীতি, ওপেকের সিদ্ধান্ত, বিশ্ব অর্থনীতির অবস্থা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি প্রভৃতির ওপর।
তেলের উচ্চমূল্য সাধারণত মূল্যস্ফীতি বাড়ায়। পণ্য পরিবহন, গরম ও জ্বালানি খরচের কারণে দৈনন্দিন পণ্যের দাম বেড়ে যায়। খাদ্যপণ্যের শেলফে পৌঁছানোর পূর্ববর্তী বিভিন্ন ধাপে জ্বালানি ব্যয় যোগ হয়, যা শেষ ভোক্তাকে বহন করতে হয়। পাশাপাশি তেলের দাম নির্ধারণে চাহিদা ও সরবরাহের পাশাপাশি ভবিষ্যতের সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিস্থিতি কাজ করে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে প্রশাসনের নীতি—যেমন ড্রিলিং-এর অনুমতি—দামের উপর প্রভাব ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন আর্কটিক ন্যাশনাল ওয়াইল্ডলাইফ রিফিউজে তেল ও গ্যাস লিজিং খুলে দেয়, যা বিদায়ী বাইডেন প্রশাসনের নীতির বিপরীত ছিল।
তেলের বাজার সাধারণত দুটি বেঞ্চমার্ক ট্র্যাক করে: ব্রেন্ট ক্রুড (বৈশ্বিক) এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) (উত্তর আমেরিকার জন্য)। ব্রেন্ট বিশ্ব বাণিজ্যের বেশির ভাগ তেলের মূল্য নির্ধারণ করে বলে ইতিহাস বিশ্লেষণেও এটি ব্যবহৃত হয়। মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসন এখন তাদের বার্ষিক এনার্জি আউটলুকে ব্রেন্টকেই প্রাথমিক রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করে। দাম কখনো স্থির থাকে না, যুদ্ধ, মন্দা, ওপেকের সিদ্ধান্ত ও সরবরাহ উদ্বৃত্তের কারণে সবসময়ই ওঠাপড়া দেখা যায়।
বাজার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তেলের ভবিষ্যৎ মূল্য পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন। চাহিদা ও সরবরাহের ওঠাপড়ার পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক ঘটনা দামকে হঠাৎ করে পরিবর্তন করতে পারে। তাই বিনিয়োগকারী ও ভোক্তাদের জন্য তেলের বাজারের গতিবিধি বোঝা জরুরি। ফরচুন ম্যাগাজিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে পরিবর্তনের ফলে তেলের বাজার নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, তেলের দাম সবসময়ই অপ্রত্যাশিত থাকবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।




