কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে সাফল্যের চাবিকাঠি হিসেবে ‘ফাউন্ডার মোড’ ধরে রাখাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন এয়ারবিএনবির প্রধান নির্বাহী ব্রায়ান চেস্কি। তার মতে, এআই প্রযুক্তির এই সময়ে কোম্পানিগুলোকে স্টার্টআপের মতো গতিশীলতা বজায় রাখতে হবে। বিশ্বাস তৈরি, খুঁটিনাটি বিষয়ে মনোযোগ এবং সংগঠিত থাকাকে তিনি অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। গত সপ্তাহে সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে চেস্কি বলেন, “এআই যুগে বিজয়ী হবে সেই সব কোম্পানি যারা রূপান্তরকে গ্রহণ করবে।” তিনি উল্লেখ করেন, এটিকেই ‘ফাউন্ডার মোড’ বলা যেতে পারে, ‘ম্যানেজার মোড’ নয়। দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিষ্ঠানের খুঁটিনাটি বিষয়ে নজর রাখার পক্ষে মত দিয়ে আসছেন চেস্কি। এখন এয়ারবিএনবির নতুন কোডের ৬০ শতাংশ এআই লিখছে, ফলে পণ্য উন্নয়নের গতি বেড়েছে। এই সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে ফরচুন ৫০০-এর এই জায়ান্ট কোম্পানিকে স্টার্টআপের মতো সচল রাখতে চান তিনি। এয়ারবিএনবির এআই প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি, টোকেন ব্যবহার এবং এআই-এর সামগ্রিক আউটপুট নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন চেস্কি। ভোক্তা পর্যায়ের এআই প্ল্যাটফর্মের বিকাশে এই খুঁটিনাটি মনোযোগই কোম্পানিটিকে এগিয়ে রাখছে বলে মনে করেন তিনি। গত ৬ আগস্ট বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সর্বশেষ আয়ের ঘোষণার সময় চেস্কি বলেন, “এআই এয়ারবিএনবির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ঘটনা। এখন আমরা এক বছর আগের চেয়ে অনেক দ্রুত নির্মাণ, পরীক্ষা এবং পুনরাবৃত্তি করতে পারছি।” এর আগে বছর শুরুতেও তিনি বিনিয়োগকারীদের জানিয়েছিলেন, এআই-এর সাহায্যে নতুন উন্নয়ন দ্রুত বাজারজাত করা যাচ্ছে এবং ধারণা থেকে লঞ্চ পর্যন্ত সময় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে এসেছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৩.৬ বিলিয়ন ডলার আয়ের পর চেস্কি জানিয়েছেন, ‘এআই-নেটিভ কোম্পানি’ হয়ে ওঠার লক্ষ্যে এ বছর এআই টোকেনে আরও বেশি ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। আয়ের ঘোষণার সময় তিনি এআই-চালিত গ্রাহক পরিষেবা টুলের কার্যকারিতার কথা উল্লেখ করেন, যা কোনো মানুষের সহায়তা ছাড়াই ৪৫ শতাংশ ব্যবহারকারীর প্রশ্নের সমাধান করেছে। পাশাপাশি এআই-চালিত সার্চ পরীক্ষা করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। চেস্কি বলেন, “সার্চ, সাইন-আপ, চেকআউট এবং পেমেন্ট—সব ক্ষেত্রে এআই কাজকে ত্বরান্বিত করছে। গ্রাহকের যাত্রাপথে প্রতিবন্ধকতা কমিয়ে আমরা বেশি ট্রাফিককে বুকিংয়ে রূপান্তর করছি, যা আমাদের বৃদ্ধির অন্যতম বড় চালিকাশক্তি।” উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে ওয়াই কম্বিনেটরের সহ-প্রতিষ্ঠাতা পল গ্রাহাম সিলিকন ভ্যালির প্রচলিত ব্যবস্থাপনা ধারণাকে ভেঙে দিয়ে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করলে ‘ফাউন্ডার মোড’ ইন্টারনেটে আলোড়ন সৃষ্টি করে। ওই প্রবন্ধটি ছিল চেস্কির একটি আলোচনার ওপর ভিত্তি করে। ফরচুনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে চেস্কি বলেছিলেন, “যখন আমি এয়ারবিএনবি শুরু করি, তখন আমি একজন প্রতিষ্ঠাতা ছিলাম। আমি সেটি চালাতাম যেভাবে একজন প্রতিষ্ঠাতা কোম্পানি চালান। আমি খুঁটিনাটি বিষয়ে ছিলাম, সবকিছু জানতাম, কোম্পানির প্রধান পণ্য কর্মকর্তা ছিলাম।” তবে এয়ারবিএনবি ১১০ বিলিয়ন ডলারের জায়ান্টে পরিণত হওয়ার পর চেস্কি তার নেতৃত্বের ধরন বদলেছেন — এখন তিনি বেশি দায়িত্ব অর্পণ করেন এবং দলের ওপর আস্থা রাখেন। তার ভাষায়, “আমাদের খুঁটিনাটি থেকে শুরু করতে হবে, আস্থা তৈরি করতে হবে, পেশির স্মৃতি গড়তে হবে, তারপর ছেড়ে দিতে হবে। মহান নেতৃত্ব হলো উপস্থিতি, অনুপস্থিতি নয়।” বর্তমানে এয়ারবিএনবিতে প্রায় ৮ হাজার ২০০ কর্মী রয়েছেন, তবুও তিনি কোম্পানিটিকে ছোট স্টার্টআপের মতোই পরিচালনা করেন। স্বায়ত্তশাসিত কাঠামোর মতো কোম্পানি পরিচালনাকে তিনি ‘আধুনিক কর্পোরেট আমেরিকার ভ্রান্ত ধারণা’ বলে অভিহিত করেছেন। ডেল টেকনোলজিস, ব্ল্যাকরক, মেটা এবং এনভিডিয়ার মতো কোম্পানিগুলোও প্রতিষ্ঠাতাদের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে। ফরচুনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফরচুন ৫০০ কোম্পানির মধ্যে ২৬টিই প্রতিষ্ঠাতা-নেতৃত্বাধীন। এদিকে এআইয়ের সম্ভাবনা নিয়ে এতটাই আশাবাদী চেস্কি যে তিনি নিজের একটি গবেষণাগার চালু করছেন। ইয়াহু ফাইন্যান্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমি মনে করি আমরা এআই নিয়ে হাজার বছরের যাত্রার শুরুতে আছি। এআই দিয়ে যা সম্ভব তার পৃষ্ঠতলও আমরা এখনও স্পর্শ করিনি।” এরই মধ্যে এয়ারবিএনবিকে ভ্রমণ ও ছুটি কাটানোর জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুর একক গন্তব্যে রূপান্তরের কাজ চলছে, যা কোম্পানির আয় ১ বিলিয়ন ডলার বাড়াতে পারে বলে ব্লুমবার্গ সূত্রে জানা গেছে। চেস্কি মনে করেন, ভোক্তা পর্যায়ের এআইতে এখনও তেমন অগ্রগতি হয়নি। নতুন এআই সফটওয়্যার উন্মোচন হতে ১৮ মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলেও তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। অবকাশ পরিকল্পনার ভবিষ্যৎ এআই চ্যাটবট প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করবে বলে মত তার। “আমি মনে করি এক বছর পর আপনি দেখবেন এটি অত্যন্ত এআই-নেটিভ হবে। পুরো শিল্পের জন্য আমি কথা বলতে পারব না, তবে আমি ধরে নিচ্ছি তাদের সবাইকে অনুসরণ করতে হবে।”