বাংলাদেশের কৃষি ইতিহাসে এক অনন্য নাম হরিপদ কাপালী। সম্পূর্ণ নিজস্ব চেষ্টায় তিনি উদ্ভাবন করেন উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত 'হরিধান'। ৯৪ বছর বয়সে ২০১৭ সালের ৬ জুলাই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিজ্ঞানচিন্তা পক্ষ থেকে গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়েছে।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ হ্রাস পেলেও খাদ্য উৎপাদন তিন গুণের বেশি বেড়েছে। এই সাফল্যের মূলে রয়েছে অসংখ্য কৃষকের নিরলস প্রচেষ্টা। ষাটের দশকের সবুজ বিপ্লবের ধারায় ইরি ও ব্রি উচ্চ ফলনশীল সংকর জাতের ধান উদ্ভাবন করলেও দেশীয় কৃষকদের হাতে সৃষ্ট হাজারো জাতের ধানের ঐতিহ্য প্রায়ই উপেক্ষিত হয়েছে। হরিপদ কাপালী সেই ধারাকে পুনরুজ্জীবিত করেন।
প্রায় দেড় দশক আগে নিজের জমিতে একটি ধানের গোছা আলাদাভাবে নজরে পড়ে তার। গাছটি ছিল মজবুত এবং ছড়ায় ধানের সংখ্যা ছিল বেশি। তিনি সেই গোছা সংরক্ষণ করে পরবর্তী মৌসুমে বীজতলা তৈরি করেন। বিআর-১১ বা স্বর্ণার তুলনায় বেশি ফলন পান। বিঘাপ্রতি বিআর-১১ এর ফলন ১৮ থেকে ২০ মণের মধ্যে থাকলেও তার উদ্ভাবিত নতুন ধানের ফলন ২২ মণ ছাড়িয়ে যায়। সারও লাগত কম।
স্থানীয় কৃষকদের কাছে এই ধান 'হরিধান' নামে পরিচিতি লাভ করে। হরিপদ নিজে বীজ বিতরণে উদার মনোভাব দেখান এবং অন্যদেরও তা ছড়িয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানান। এর ফলে ঝিনাইদহ থেকে আশপাশের জেলাগুলোতে হরিধানের প্রসার ঘটে। ২০০৫ সালে প্রথম আলো পত্রিকার একটি প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো এই আবিষ্কার গণমাধ্যমের নজরে আসে।
যশোর গণিত উৎসবে হরিপদ কাপালীকে সম্মানিত করা হয়। জিনবিজ্ঞানী আবেদ চৌধুরী ফুল দিয়ে তাকে বরণ করে নেন। মঞ্চে তিনি শিশুদের উদ্দেশে প্রকৃতির দিকে নজর রাখার পরামর্শ দেন। হরিধান প্রকৃতপক্ষে একটি নতুন জাত কি না, তা যাচাই করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেবা ইসলাম সেরাজের তত্ত্বাবধানে জিনগত গবেষণা পরিচালিত হয়। গবেষণায় প্রমাণিত হয়, মাঠেই বিআর-১১-এর প্রাকৃতিক সংকরায়নের মাধ্যমে হরিধানের সৃষ্টি হয়েছে। এই ফলাফল আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হলে বিতর্কের অবসান ঘটে।
২০০৬ সালে হরিপদ কাপালী চ্যানেল আই কৃষি পদক লাভ করেন। তার আবিষ্কার মাঠভিত্তিক বিজ্ঞান চর্চার গুরুত্ব পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করে। নিবন্ধে বলা হয়েছে, প্রকৃতিকে ল্যাবরেটরি হিসেবে ব্যবহার করে কৃষক-বিজ্ঞানীদের সহায়তা করা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে খাদ্য সংকট মোকাবিলায় হরিপদ কাপালীগণই প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন।




