দীর্ঘ ২৪ বছর আগে এসএসসি পরীক্ষায় ব্যর্থতার তিক্ত অভিজ্ঞতা ছিল নাসিমুল হকের। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ভোলাহাট এলাকার বাসিন্দা এই কাঠমিস্ত্রি অবশেষে সেই পরীক্ষাতেই উজ্জ্বল সাফল্য পেয়েছেন। ৪৩ বছর বয়সে অংশ নিয়ে তিনি জিপিএ ৪.৬২ পেয়েছেন, যা তাঁর জীবনে যেন নতুন আশার আলো দেখিয়েছে।

২০০২ সালে ভোলাহাটের বাচ্চামারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে অকৃতকার্য হয়েছিলেন নাসিমুল। দ্বিতীয়বার চেষ্টা করার আগ্রহ থাকলেও পারিবারিক অভাব-অনটন তাঁকে তা করতে দেয়নি। বাবার সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছিল, ফলে জীবিকার পথ হিসেবে বেছে নিতে হয় কাঠমিস্ত্রির পেশা। এই কাজ শেখার পর সংসারের হাল ধরেন তিনি। পরে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং তিন সন্তানের জনক হন। মা-বাবাসহ সাত সদস্যের পরিবার এখন তাঁর উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল।

পড়াশোনার প্রতি টান অবশ্য কখনো হারিয়ে যায়নি। সন্তানদের লেখাপড়ার বিষয়ে তিনি সব সময় সচেতন ছিলেন। যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর সন্তানেরা পড়াশোনা করত, নাসিমুল সেই বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য ছিলেন। পরবর্তীকালে স্থানীয় মানুষ তাঁকে সভাপতি পদে দেখতে চাইলে একটি নিয়ম বাধা হয়ে দাঁড়ায়—এসএসসি পাস ছাড়া সেই পদে থাকা সম্ভব নয়। এই ঘটনা তাঁকে গভীরভাবে আঘাত করে। তিনি বলেন, ‘খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। তখন মনে হলো, যেভাবেই হোক সার্টিফিকেট অর্জন করতে হবে।’ সেই সিদ্ধান্ত থেকেই ২০২৪ সালে ভোকেশনাল শাখায় ভর্তি হন তিনি।

দিনভর কাঠমিস্ত্রির কাজ শেষ করে সন্ধ্যায় ভোলাহাটের ফার্নিচার শ্রমিক ইউনিয়নের ছোট্ট অফিস ঘরে বসতেন তিনি। ওই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সেখানে বই-খাতা খুলে রাত ১১টা পর্যন্ত চালাতেন পড়াশোনা। তাঁর এই প্রচেষ্টা দেখে আশপাশের অনেকেই হাসাহাসি করতেন। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলতেন, ‘এই বয়সে লেখাপড়া করে আর কী হবে?’ তবে কারও কথায় কর্ণপাত করেননি নাসিমুল।

তিনি চেয়েছিলেন তাঁর কয়েকজন সহকর্মীও এগিয়ে আসুক, কিন্তু তাদের অনেকেই ঠাট্টা করে সরিয়ে দিয়েছেন তাঁকে। এখন সেই সহকর্মীরাই সবচেয়ে বেশি আনন্দ প্রকাশ করছেন। ফার্নিচার শ্রমিক সংগঠনের সদস্য সাকির আলী হাসতে হাসতে বলেন, ‘মনে হইছে হামরাই পাস কোরছি। আগে ঠাট্টা করছি, এখন খুব আনন্দ লাগছে।’

নাসিমুলের নিজের উপলব্ধি খুব সরল। তাঁর ভাষ্য, ‘অনেক জায়গায় যেতে হলে সার্টিফিকেট লাগে। আমি আর কোনো সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকতে চাই না।’ ২৪ বছর আগে যে পরীক্ষায় হোঁচট খেয়েছিলেন, সেই পরীক্ষাই এবার তাঁকে নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। তবে এটিকে শেষ গন্তব্য মনে করছেন না তিনি। এসএসসি পাস করেই থেমে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই। তাঁর ইচ্ছা, সামনে আরও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার।