মার্কিন স্বাধীনতা ঘোষণার ২৫০তম বার্ষিকী উদযাপনের পর দেশটির সংবিধানের নকশা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইতিহাসবিদরা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে স্বাধীনতা ঘোষণা ছিল কেবল প্রথম পদক্ষেপ; প্রকৃত একীভূত রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রয়োজন হয়েছিল সংবিধান। ফেডারেলিস্ট পেপারস নামে পরিচিত ৮৫টি প্রবন্ধে আলেকজান্ডার হ্যামিলটন, জেমস ম্যাডিসন ও জন জে যুক্তি দেন যে মানব প্রকৃতির অন্তর্নিহিত ত্রুটিগুলো মোকাবিলা করেই সরকার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
মার্কিন বিপ্লব যুদ্ধ শেষে দেশটি শিথিল রাজ্যসমূহের জোটে পরিণত হয়। কনফেডারেশনের আর্টিকেলস নামে প্রথম সংবিধানটি ১৭৭৭ সালে প্রণীত হলেও এর অনুমোদন ধীরগতিতে সম্পন্ন হয়। রাজ্যগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও নিজ নিজ স্বার্থরক্ষার প্রবণতার কারণে জাতীয় সরকার ছিল অত্যন্ত দুর্বল। এই কাঠামোতে কোনো শক্তিশালী নির্বাহী বিভাগ ছিল না, ছিল না জাতীয় বিচারব্যবস্থাও। আইনসভা ছিল এককক্ষবিশিষ্ট, যেখানে প্রতিটি রাজ্যের একটি করে ভোট ছিল এবং গুরুত্বপূর্ণ আইন পাসের জন্য প্রয়োজন হতো বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা।
১৭৮০-এর দশকে নিউবার্গ ষড়যন্ত্র, আন্তঃরাজ্য বাণিজ্য বিবাদ, অর্থনৈতিক মন্দা এবং শেইসের বিদ্রোহ মার্কিন নেতাদের সরকার ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনায় বাধ্য করে। ড্যানিয়েল শেইসের নেতৃত্বে পশ্চিম ম্যাসাচুসেটসের কৃষকরা যুদ্ধকালীন ঋণ পরিশোধের জন্য আরোপিত করের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। এই ঘটনা সাংবিধানিক সম্মেলনের প্রতিনিধিদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
১৭৮৭ সালের গ্রীষ্মে ফিলাডেলফিয়ায় অনুষ্ঠিত সম্মেলনে জাতীয়তাবাদী চিন্তাবিদরা একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে মত দেন। তাদের মতে সরকারের সঠিক ভূমিকা হলো মানুষকে তাদের নিজেদের থেকেও রক্ষা করা। হ্যামিলটন, ম্যাডিসন ও জে-র মতে মানব স্বভাব স্বাভাবিকভাবেই উচ্চাভিলাষী, প্রতিহিংসাপরায়ণ ও লোভী। তাই তারা দুর্বল সরকারের পরিবর্তে শক্তিশালী কেন্দ্রীয় কাঠামোর পক্ষে যুক্তি দেন।
ফেডারেলিস্ট পেপারসের ৫১তম প্রবন্ধে ম্যাডিসনের বিখ্যাত পর্যবেক্ষণ, 'মানুষ যদি ফেরেশতা হতো, তাহলে সরকারের প্রয়োজন হতো না।' তিনি আরও যুক্তি দেন যে মানব প্রকৃতিতে 'এক মাত্রার নৈতিক অধঃপতন' রয়েছে, যা নিয়ন্ত্রণের জন্যই সংবিধানের কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। তবে তিনি স্বীকার করেন যে মানব প্রকৃতিতে এমন কিছু গুণও বিদ্যমান যা আস্থা ও সম্মানের দাবি রাখে।
ফেডারেলিস্ট পেপারস মূলত অ্যান্টি-ফেডারেলিস্টদের সমালোচনার জবাবে রচিত। অ্যান্টি-ফেডারেলিস্টরা মনে করতেন প্রস্তাবিত সংবিধান কেন্দ্রীয় সরকারকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেবে এবং বিপ্লবের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা বিপন্ন করবে। পাবলিয়াস ছদ্মনামে লেখা প্রবন্ধগুলোতে হ্যামিলটন, ম্যাডিসন ও জে দেখাতে চেয়েছেন যে মানব স্বভাবের দুর্বলতার কারণেই শক্তিশালী সরকার অনিবার্য।
নতুন সংবিধানে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা, শক্তিশালী নির্বাহী বিভাগ ও জাতীয় বিচারব্যবস্থার প্রস্তাবনা ছিল। পাশাপাশি একীভূত বাণিজ্য নিয়ম, মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ এবং বিদ্রোহ দমনের ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারকে দেওয়ার কথা বলা হয়। এই কাঠামো কনফেডারেশনের আর্টিকেলসের শিথিল ব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল।
ফেডারেলিস্ট পেপারসের লেখকরা বিশ্বাস করতেন যে সুষ্ঠু সাংবিধানিক নকশা ও ভারসাম্যপূর্ণ সরকার মানব স্বভাবের বিপজ্জনক প্রবণতাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তাদের মতে, আইন ভঙ্গের জন্য দণ্ডের বিধান না থাকলে আইন কেবল উপদেশ বা সুপারিশে পরিণত হয়। তাই তারা একটি কার্যকর জবরদস্তিমূলক কর্তৃত্বের পক্ষে অবস্থান নেন।
এই বিশ্লেষণটি দ্য কনভারসেশন থেকে ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্সের অধীনে পুনঃপ্রকাশিত। মূল প্রতিবেদনটি ফরচুন ডট কমে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।




