দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছয় শতাধিক প্রতিষ্ঠানে ভোকেশনাল শিক্ষা কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। বাস্তবে সেখানে শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত ত্রুটি ও কার্যকর তদারকির অভাবে শিক্ষা কার্যক্রম একেবারেই চালু নেই। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ভোকেশনাল শিক্ষা পরিচালনার অনুমোদনপ্রাপ্ত ৩ হাজার ৪৪০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬২১টিতে দীর্ঘদিন ধরে কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি বা শিক্ষা কার্যক্রমই নেই। এর মধ্যে ৪৪৩টিতে এসএসসি (ভোকেশনাল) এবং ১৭৮টিতে দাখিল (ভোকেশনাল) পাঠদানের অনুমোদন রয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর এই প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীশূন্য ছিল।
লক্ষ্মীপুরের হাসন্দী উচ্চবিদ্যালয় ২০১০ সালে ভোকেশনাল শিক্ষা চালুর অনুমতি পেলেও আজ পর্যন্ত সেখানে কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি। কারণ, শুরু থেকেই বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ হয়নি এবং কার্যকর শিক্ষা কার্যক্রম গড়ে ওঠেনি। একই অবস্থা কুমিল্লার কালীর বাজার উচ্চবিদ্যালয়ের, যেখানে প্রায় ১৮ বছর ধরে ভোকেশনাল শাখা বন্ধ। ২০০৮ সালে শিক্ষার্থী সংকট ও এমপিওভুক্ত শিক্ষকের অভাবে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ময়মনসিংহের কেওয়াটখালী উচ্চবিদ্যালয়েও ২০০৪ সালে ভোকেশনাল চালু হলেও ২০১২ সালের পর আর স্বীকৃতি নবায়ন করা হয়নি। সিলেটের ঢালারপাড় উচ্চবিদ্যালয়েও ভোকেশনাল অনুমতি থাকলেও বর্তমানে সেখানে কোনো শিক্ষার্থী নেই।
শুধু অচল প্রতিষ্ঠানই নয়, যেসব প্রতিষ্ঠানে কার্যক্রম চলছে সেখানেও অনেক আসন খালি পড়ে আছে। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট ১৯ লাখ ৭৪ হাজারের বেশি আসনের বিপরীতে ভর্তি হয়েছেন প্রায় পৌনে ১০ লাখ শিক্ষার্থী। সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোতে ৪৩ হাজার ৫০০ আসনের মধ্যে ভর্তি হয়েছেন ৩৮ হাজার ১৯১ জন, অন্যদিকে বেসরকারি পলিটেকনিকে ১ লাখ ৬০ হাজার আসনের মধ্যে ভর্তি হয়েছেন মাত্র ৩০ হাজার ৬১৪ জন। এসএসসি (ভোকেশনাল) পর্যায়ে ৫ লাখ ৬৭ হাজার ৩০০ আসনের মধ্যে ভর্তি হয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার ৭১৫ জন, অর্থাৎ প্রায় চারটি আসনের মধ্যে একটি পূরণ হয়েছে। ডিপ্লোমা ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়েও একই চিত্র—৭১ হাজার আসনের বিপরীতে ভর্তি মাত্র ৬ হাজার ৬০৬ জন।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. রুহুল আমিন জানান, প্রথম লক্ষ্য হলো রুগ্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করা। নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে প্রকৃত শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে না পারলে মন্ত্রণালয়ের কমিটির মাধ্যমে ধাপে ধাপে সেগুলো বন্ধের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে প্রথম দফায় ২২ জুন এবং দ্বিতীয় দফায় ২৩ জুলাই কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, পরিকল্পনা ছাড়া বিপুল সংখ্যক বেসরকারি কারিগরি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দেওয়া হলেও প্রয়োজনীয় শিক্ষক, ল্যাবরেটরি ও শিক্ষা উপকরণের ব্যবস্থা করা হয়নি। ভোকেশনাল শিক্ষার সবচেয়ে বড় সংকট শিক্ষক সংকট বলে মন্তব্য করেন বোর্ডের এক কর্মকর্তা। প্রায় ২০০টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সরকারি হওয়ার পর ভোকেশনাল শিক্ষকদের সাধারণ শিক্ষায় স্থানান্তর করায় সংকট আরও বেড়েছে।
সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষায় শিক্ষার্থীর হার ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও বাস্তবে মানোন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ কম। শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সারাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ‘স্কুল ম্যাপিং’ করে প্রয়োজন অনুযায়ী অনুমোদন, শিক্ষক নিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি। অপরিকল্পিত সম্প্রসারণের পরিবর্তে গুণগত মান নিশ্চিত করলেই কেবল কারিগরি শিক্ষা সত্যিকার অর্থে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারবে।




