মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর একটি আমাদের একেবারে পায়ের নিচেই লুকিয়ে আছে। আমরা সবাই জানি, হাত থেকে ছাড়া পেলে যেকোনো বস্তু সোজা মাটিতে পড়ে যায়। কিন্তু কেন তা নিচের দিকেই পড়ে, উপরের দিকে বা পাশে উড়ে যায় না? এই সহজ প্রশ্নের জটিল উত্তরের খোঁজেই বিজ্ঞানের ইতিহাসে ঘটে গিয়েছিল এক বিস্ময়কর ঘটনা। খেয়ালি এক বিজ্ঞানী, অন্ধকার ঘরে বসে একা হাতে মেপে ফেলেছিলেন গোটা পৃথিবীর ওজন। তাঁর নাম হেনরি ক্যাভেন্ডিশ।
আইজ্যাক নিউটন ১৬৬৫ সালে প্লেগ মহামারির কারণে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকার সময় গ্রামের বাড়িতে গিয়ে আপেল পড়া দেখে মহাকর্ষের ধারণা দেন। তাঁর সেই যুগান্তকারী সূত্র বলে, মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু একে অপরকে আকর্ষণ করে। ভর যত বেশি, আকর্ষণ তত বেশি; আর দূরত্ব বাড়লে তা কমে যায়। নিউটন তাঁর সমীকরণ F = G (m1·m2)/r²-তে এই আকর্ষণের হিসাব দেখালেও রহস্যময় 'G' (সর্বজনীন মহাকর্ষীয় ধ্রুবক) ধ্রুবকটির মান তিনি বের করতে পারেননি। এই G-এর মানই বলে দেয় মহাকর্ষ শক্তি কতটা শক্তিশালী। এর মান জানা না থাকায় পৃথিবীর ভর বা ঘনত্ব নির্ণয় ছিল অসম্ভব।
১৭৭৫ সালে রয়্যাল সোসাইটির বিজ্ঞানীরা স্কটল্যান্ডের শিহালিয়ন পাহাড়ের মহাকর্ষীয় টান মেপে পৃথিবীর ঘনত্ব বের করার চেষ্টা করেন। নেভিল মাস্কেলিনের নেতৃত্বে সেই অভিযানে পাহাড়ের পাশে ঝুলন্ত দড়ির বেঁকে যাওয়া থেকে হিসাব করে পৃথিবীর ঘনত্ব পানির সাড়ে চার গুণ বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু পাহাড়ের অভ্যন্তরের পাথরের ঘনত্ব নিয়ে অনুমানের কারণে সেই ফলাফল নিখুঁত ছিল না।
ঠিক সেই সময়েই আবির্ভাব ঘটে হেনরি ক্যাভেন্ডিশের। ১৭৩১ সালে ফ্রান্সের নিস শহরে এক অভিজাত পরিবারে তাঁর জন্ম। বিপুল ধনসম্পদের উত্তরাধিকারী হওয়ায় তিনি নিজের খেয়ালে গবেষণায় ডুবে থাকতে পেরেছিলেন। কিন্তু মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত অদ্ভুত। তাঁর গলা ছিল অস্বাভাবিক রকমের সরু ও তীক্ষ্ণ, আর পোশাক পরতেন দাদাদের আমলের, যা সেই যুগের চেয়ে ৫০ বছর পুরোনো। নারীদের ভয়ে তিনি তাঁর বাড়িতে আলাদা পেছনের সিঁড়ি বানিয়ে রেখেছিলেন। পরিচিতদের সঙ্গে কথা বলতে চাইতেন না; এমনকি নৈশভোজে তাঁর ছবি আঁকা হয়েছিল গোপনে। তাঁর প্রথম জীবনীকার জর্জ উইলসনের ভাষায়, তাঁর মস্তিষ্ক ছিল কেবলই ক্যালকুলেটিং মেশিন, আর হৃদয় ছিল রক্ত চলাচলের পাম্প। এই অসামাজিক মানুষটিই কিন্তু বৈদ্যুতিক ভোল্টেজ ও চার্জের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে 'ওহমের সূত্র' ও 'কুলম্বের সূত্র' আগে আবিষ্কার করেছিলেন, কিন্তু সেগুলো প্রকাশ করেননি বলে তাঁর নামে নামকরণ হয়নি।
ক্যাভেন্ডিশের কাছে এসে পৌঁছায় জন মিশেল নামে এক বিজ্ঞানীর তৈরি 'টর্শন ব্যালান্স' বা মোচড় দাঁড়িপাল্লা। মিশেল মারা যাওয়ায় যন্ত্রটি অসম্পূর্ণ ছিল। ক্যাভেন্ডিশ যন্ত্রটিকে নতুন করে সাজিয়ে নেন। ছয় ফুট লম্বা কাঠের দণ্ডের দুই প্রান্তে দুটি ছোট সিসার বল ঝুলিয়ে তাকে একটি সরু তার দিয়ে ছাদ থেকে ঝুলিয়ে দেন। দণ্ডটির কাছে রাখা হয় ১২ ইঞ্চি ব্যাসের বিশাল দুটি সিসার গোলক, যার প্রতিটির ওজন ছিল ৩৫০ পাউন্ড। বড় গোলকগুলোর মহাকর্ষীয় টানে ছোট বলগুলো সামান্য সরে গিয়ে তারে যে মোচড় তৈরি করবে, সেই মোচড় মেপেই বের করা হবে আকর্ষণ বলের পরিমাণ।
কিন্তু এই পরীক্ষা ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম। মহাকর্ষ বল এতই দুর্বল যে মশার ডানার বাতাস বা ঘরের সামান্য তাপমাত্রার পরিবর্তনও ফলাফল নষ্ট করে দিতে পারত। তাই ক্যাভেন্ডিশ যন্ত্রটি বাগানের একটি ঘরে পুরোপুরি সিল করে দেন এবং বাইরে থেকে কপিকলের সাহায্যে বড় গোলকগুলো ঘোরানোর ব্যবস্থা করেন। দূর থেকে টেলিস্কোপ দিয়ে তিনি স্কেলে নির্দেশকের রিডিং নিতেন। লোহার রডের কারণে চৌম্বকীয় প্রভাব হতে পারে বলে তিনি তামার রড ব্যবহার করেন। এমনকি কাঠের বাক্সের মহাকর্ষীয় টানও তিনি হিসাব করে বাদ দিয়েছিলেন।
১৭৯৭ সাল থেকে মাসের পর মাস তিনি এই একঘেয়ে পরীক্ষা চালিয়ে যান। পরীক্ষার সময় টেলিস্কোপে চোখ রেখে টানা আড়াই ঘণ্টা তিনি মূর্তির মতো বসে দোলন পর্যবেক্ষণ করতেন। অবশেষে তিনি ঘোষণা করেন, পৃথিবীর ঘনত্ব পানির ঘনত্বের ৫.৪৮ গুণ। আধুনিক প্রযুক্তিতে বিজ্ঞানীরা এই ঘনত্ব বের করেছেন ৫.৫১, অর্থাৎ ক্যাভেন্ডিশের হিসাবের সঙ্গে পার্থক্য ১ শতাংশেরও কম।
ক্যাভেন্ডিশের মৃত্যুর প্রায় এক শতাব্দী পর বিজ্ঞানীরা তাঁর পরীক্ষার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখতে পান, আসলে তিনি নিজের অজান্তেই মহাকর্ষীয় ধ্রুবক G-এর মান বের করে ফেলেছিলেন। তাঁর পরীক্ষার ডেটা ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা G-এর মান নির্ণয় করেন, যা আধুনিক বিজ্ঞানে ৬.৬৭৪ × ১০^-১১ মি³ কেজি^-১ সে^-২। আজ মহাকাশযান মঙ্গলে অবতরণ, স্যাটেলাইটের কক্ষপথ বা বিগ ব্যাং-এর হিসাব—সবকিছুর ভিত্তিতে রয়েছে এই G-এর মান, যা সম্ভব হয়েছে হেনরি ক্যাভেন্ডিশের সেই খামখেয়ালি অথচ নিখুঁত পরীক্ষার কারণে।




