রাজধানীর আজিমপুর ছোটমণি নিবাসে হামের প্রকোপে গত কয়েক মাসে পাঁচটি শিশু প্রাণ হারিয়েছে। সর্বশেষ শুক্রবার দিবাগত রাতে কিউর স্পেশালাইজড হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় ৮ মাস বয়সী মাহির। হাম ও হাম–পরবর্তী জটিলতায় ভুগছিল সে। সেই শিশুটির মরদেহ শনিবার সকাল পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের পাশে পড়েছিল। পরে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কর্মীরা কোলেই করে তা অ্যাম্বুলেন্সে তুলে নেন। বেওয়ারিশ হিসেবে মাহিরকে জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়। তার শেষকৃত্যে কোনো স্বজন ছিল না।

মাহির জন্ম থেকেই ছিল পরিত্যক্ত। গত জানুয়ারি মাসে কাশিমপুর থানার মাধ্যমে গাজীপুরের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নির্দেশে তাকে আজিমপুরের ছোটমণি নিবাসে পাঠানো হয়। নিবাসের উপতত্ত্বাবধায়ক তানজিনা আফরিন জানান, হাম, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে মাহিরকে প্রথমে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। প্রায় দুই মাস চিকিৎসার পর ৫ জুলাই তাকে নিবাসে ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু পরের দিনই শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হয়। ভর্তির পর ৯ জুলাই অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে তাকে কিউর হাসপাতালের বিশেষায়িত আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে শিশুটি।

একই নিবাসের চার শিশু আগেই হামের বলি হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছে ৩ মাস ১৮ দিন বয়সী মুনা, ৯ মাস বয়সী খুশবু, এক বছরের কিছু বেশি বয়সী আরিশা ও ৫ মাস বয়সী মেহেদী। সবারই বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন সম্পন্ন হয়েছে। মুনার জন্ম হয়েছিল ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে। তার মা ছিলেন মানসিক ভারসাম্যহীন। খুশবুর মামলা আরও মর্মস্পর্শী। মা খুন হওয়ার পর বাবা কারাগারে যান। তখন মাত্র ৪৫ দিন বয়সী খুশবুকে আদালতের আদেশে নিবাসে পাঠানো হয়। আরিশা রাজবাড়ী থেকে উদ্ধার হওয়ার সময় তার বয়স ছিল এক মাসের মতো। মেহেদী জন্মের এক দিন পর সড়ক থেকে উদ্ধার হয়েছিল।

নিবাসের উপতত্ত্বাবধায়ক তানজিনা আফরিন জানান, বর্তমানে নিবাসে ৩৮টি শিশু রয়েছে। এক জায়গায় বিভিন্ন বয়সের শিশু থাকায় হামের মতো সংক্রামক রোগ থেকে তাদের রক্ষা করা চ্যালেঞ্জিং। শুধু হাম নয়, স্ক্যাবিস বা চুলকানির মতো রোগও তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে। নিবাসের জনবল অপ্রতুল, তবুও শিশুদের বাঁচাতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, পরিবার বা দাবিদার না থাকায় নিয়ম অনুযায়ী তাদের বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করতে হচ্ছে।

মৃত শিশুদের আইনি প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রথমে তেজগাঁও থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। যেহেতু কারও অভিযোগ নেই, তাই বিনা ময়নাতদন্তে মরদেহ হস্তান্তরের জন্য আবেদন করা হয়েছে। একাধিক নথি সই-সহ আনুষ্ঠানিকতা শেষে মরদেহ দাফনের জন্য আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রতিষ্ঠান) সমীর মল্লিক জানান, হামের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে আজিমপুর নিবাসের পাঁচ শিশু মারা গেছে। বর্তমানে নিবাসের আর কোনো শিশু হাম জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি নেই। তিনি জনবল সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, আক্রান্ত শিশুদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা ও পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তারপরও কয়েকজনকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

এদিকে নিবাসের অফিস সহকারী আয়েশা বেগম জানান, তিনি ২০২২ সাল থেকে কর্মরত। এর আগে এত অল্প সময়ে এত শিশুর মৃত্যু তিনি দেখেননি। হাম ও হাম–পরবর্তী জটিলতা ও বসন্তের জন্য আজিমপুর নিবাসের প্রায় ২০ শিশুকে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা করানো হয়। করুণ পরিণতি এড়াতে নিবাস কর্তৃপক্ষ আরও কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছে।