গ্রিক শব্দ জিও (পৃথিবী) ও মেট্রন (পরিমাপ) থেকে জ্যামিতি বা জিওমেট্রির উৎপত্তি। এর মূল অর্থই হলো ভূমি পরিমাপ। ইতিহাসে গণিতবিদরা বাস্তব দুনিয়ার পরিমাপকাজে জ্যামিতির বিস্ময়কর প্রয়োগ ঘটিয়েছেন, যা রূপকথাকেও হার মানায়।

আড়াই হাজার বছরেরও বেশি আগে মিশরের গিজার মহাপিরামিডের উচ্চতা নির্ণয় এক বিস্ময়ের নাম। আধুনিক কোনো যন্ত্রপাতি ছাড়াই গ্রিক দার্শনিক থেলিস একটি সাধারণ লাঠি ও জ্যামিতিক অনুমানের ওপর ভর করে এই অসাধ্য সাধন করেছিলেন। তিনি প্রথমে লাঠির দৈর্ঘ্য ও তার ভূমিতে পড়া ছায়ার দৈর্ঘ্য মেপে নিলেন।

কিন্তু পিরামিডের বেলায় সমস্যা ছিল, কারণ তার বিশাল ভিত্তির কারণে ছায়ার সূচনাবিন্দু ছিল কেন্দ্রে, যা পাথরের নিচে চাপা। থেলিস কৌশলে পিরামিডের বাইরের প্রান্ত থেকে ছায়ার শেষ বিন্দু পর্যন্ত দূরত্ব মেপে এর সঙ্গে ভিত্তির দৈর্ঘ্যের অর্ধেক যোগ করলে কেন্দ্র থেকে ছায়াপ্রান্তের মোট দৈর্ঘ্য পাওয়া গেল। সূর্যরশ্মি পৃথিবীতে সমান্তরালভাবে পতিত হওয়ায়, লাঠি ও পিরামিড থেকে সৃষ্ট ত্রিভুজ দুটি ছিল সদৃশ।

সদৃশ ত্রিভুজের বাহুগুলোর অনুপাত সমান থাকার সূত্র ধরে থেলিস একটি সমীকরণ দাঁড় করালেন: পিরামিডের উচ্চতা ও তার মোট ছায়ার অনুপাত, লাঠির উচ্চতা ও তার ছায়ার অনুপাতের সমান। একমাত্র পিরামিডের উচ্চতা অজানা থাকায় সরল অংকে তা বেরিয়ে এলো। জ্যামিতির এই যুগান্তকারী প্রয়োগের সম্মানে ১৯৯৪ সালে গ্রিস সরকার থেলিসের ছবি সংবলিত একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করে।

আরও দুই শ বছর পর, খ্রিস্টপূর্ব ২৪০ অব্দে আলেকজান্দ্রিয়ার পণ্ডিত ইরাতোস্থেনিস ভিন্ন এক স্বপ্ন দেখলেন: সমগ্র পৃথিবীর পরিধি মাপার। সাইন (অাসোয়ান) নগরীতে গ্রীষ্মের সবচেয়ে বড় দিনে ঠিক দুপুরে খাড়া কোনো খুটির ছায়া পড়ে না বা গভীর কুয়োর তলায় সূর্যের আলো পৌঁছায়—এই তথ্য জানতে পেরে তিনি কৌতূহলী হয়ে উঠলেন। একই দিনে ও সময়ে আলেকজান্দ্রিয়ার সূর্যকিরণ ও লাঠির মাথায় ৭.২ ডিগ্রি কোণ তৈরি করছিল এবং মাটিতে ছায়া পড়ছিল।

পৃথিবী সমতল হলে এভাবে ছায়া পড়ার কথা নয়, সুতরাং তার পৃষ্ঠ বক্রাকার—এটি উপলব্ধি করে ইরাতোস্থেনিস জ্যামিতির একান্তর কোণের সূত্র প্রয়োগ করলেন। তিনি প্রমাণ করলেন, লাঠির আলো ও সৃষ্ট ৭.২° কোণটি পৃথিবীর কেন্দ্রিতেও সমান। যেহেতু একটি বৃত্তের কেন্দ্রে ৩৬০° কোণ, তাহলে ৩৬০ ভাগ ৭.২ হলো ৫০। অর্থাৎ আলেকজান্দ্রিয়া ও সাইনের মধ্যকার দূরত্ব পৃথিবীর সম্পূর্ণ পরিধির পঞ্চাশ ভাগের এক ভাগ। তখনকার একক 'স্টেড'হিসেবে দুইয়ের দূরত্ব ছিল ৫,০০০ স্টেড, অর্থাৎ পৃথিবীর পরিধি তার ৫০ গুণ বা ২,৫০,০০০ স্টেড। বর্তমান বিশেষদের মতে এটি প্রায় ৩৭,৫০০ থেকে ৫০,০০০ কিলোমিটারের কাছাকাছি, যা স্যাটেলাইট মেপা প্রকৃত পরিধি প্রায় ৪০,০৭৫ কিলোমিটারের অত্যন্ত নিখুঁত ধারণা দেয়।

ব্যবহারিক জ্যামিতিতে একশ বছর আগে ১৯২৯ সালে ইংল্যান্ডের এক শিক্ষার্থী ত্রিভুজের তিন কোণ মেপে যোগফল ঠিক ১৮০° বসায় একটু কৌশল অবলম্বন করেছিল। কোণগুলো চাঁদা মেলাতে যোগফল ১৭৫° বা ১৮৩° হয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থী মান একটু বাড়িয়ে-কমিয়ে এক্কেবারে নির্ভুল যোগফল খাতায় লিখে দিয়েছিল, যাতে শিক্ষকের বকুনি থেকে বাঁচা যায়। অন্যদিকে, জমিজমার ভাগাভাগি থেকে ক্ষেত্রফলের ধারণার শুরু। আয়তক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের গুণফল। সমকোণী ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল এর অর্ধেক, অর্থাৎ ১/২ (ভূমি × উচ্চতা)। এই সাধারণ সূত্র থেকেই পরবর্তীকালে জ্যামিতির বিখ্যাত পিথাগোরাসের উপপাদ্যর জন্ম হয়েছিল।