রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চার বছরের শিশু আলোর চিকিৎসা চলছে। তার শরীরের নানা জায়গায় র্যাশ ছড়িয়ে পড়েছে, মাথা ও গলায় বিশেষ করে। মাঝে মাঝেই কাশি হচ্ছে ছোট্ট এই রোগীর। হাসপাতালের বিছানায় ক্যানুলা হাতে শুয়ে থাকা আলোর পাশে বসে আছেন তার মা হাশরা আক্তার। তিনি একাই মেয়ের সেবা করছেন, ওষুধ কিনছেন এবং চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলছেন। গত তিন দিন ধরে এই একাকী সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
হাশরা জানান, তিনি মহাখালীর সাততলা বস্তির একটি টিনশেড ঘরে তিন মেয়েকে নিয়ে থাকেন। তার স্বামী ভ্যানচালক হলেও মাদকাসক্ত হওয়ায় সংসারে কোনো টাকা দেন না; বরং হাশরার কাছেই টাকা দাবি করেন। বাজারের টাকা চাইলে মারধর করতেন বলে জানান তিনি। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে মেয়েদের নিয়ে আলাদা হয়ে যান হাশরা। বর্তমানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করে মাসে ১০ হাজার টাকা বেতন পান। এই সামান্য আয় দিয়েই চারজনের সংসার চলে। প্রতি মাসে তিন হাজার টাকা ভাড়া ও বড় দুই মেয়ের পড়াশোনার জন্য আরও আড়াই হাজার টাকা খরচ হয়। বাকি সাড়ে চার হাজার টাকায় মাসের খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানো প্রায় অসম্ভব।
মেয়ের অসুস্থতা নতুন করে বিপদে ফেলেছে হাশরাকে। গত তিন দিনে ওষুধ কিনতে তার জমানো দুই হাজার টাকা শেষ হয়ে গেছে। এখন হাতে আর কোনো টাকা নেই। সামনে কত দিন হাসপাতালে থাকতে হবে বা ওষুধের খরচ কীভাবে জোগাবেন—সেই চিন্তায় তিনি দিশেহারা। হঠাৎ করে হাসপাতালে আসায় কর্মস্থলেও কিছু জানাতে পারেননি। হাশরা বলেন, ‘মাইয়ার জান আগে। অফিসে গিয়ে বুঝাইয়া কমু। মাইয়ার টেনশনে লগে মোবাইলও আনতে পারি নাই।’
হাসপাতালে হাশরার মা মাঝেমধ্যে এসে খোঁজ নিলেও স্বামী ও তাঁর পরিবারের কেউ দেখতে আসেননি। ক্ষোভ নিয়ে হাশরা বলেন, ‘আজ সাতটা দিন বাচ্চাডার অসুখ। স্বামীর ঘরের একটা মানুষও দেখতে আইল না।’ শিশুটির দাদা-দাদিও একই বস্তিতে থাকেন।
হাশরা নিজে অভাবের কারণে তৃতীয় শ্রেণির বেশি পড়তে পারেননি। পোশাক কারখানায় ভালো চাকরির চেষ্টা করেও শিক্ষাগত যোগ্যতা কম থাকায় সুযোগ পাননি। সেই আক্ষেপ থেকেই নিজের মেয়েদের শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে চান তিনি। হাশরা বলেন, ‘মাইয়াগো যতটা পারি পড়ামু। মাইয়ারাও আমার মতো কষ্টে পড়ুক, হেইডা চাইনা।’
এদিকে, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে হামের রোগীর চাপ আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। বর্তমানে হাসপাতালটিতে হামের উপসর্গ নিয়ে এবং নিশ্চিত হামে আক্রান্ত ২৮ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত দুই সপ্তাহে এখানে হামে আক্রান্ত কোনো রোগীর মৃত্যু হয়নি। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক এফ এ আসমা খান জানান, হামের প্রকোপের শুরুতে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়ার সংক্রমণ বেশি দেখা গিয়েছিল। এখন সেই প্রবণতা কমেছে। তবে সম্প্রতি চার থেকে সাত বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে হামে আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি দেখা যাচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে সাতজন রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজনের শরীরে হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। একই সময়ে সুস্থ হয়ে আটজন রোগী হাসপাতাল ছেড়েছেন।




