যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক কার্যকর হওয়ার আগেই ভেঙে পড়েছে। হরমুজ প্রণালিতে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে দেওয়া তেল বিক্রির বিশেষ ছাড় বাতিল করেন এবং টানা দুই রাত ধরে ইরানের ১৭০টির বেশি সামরিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালান। এর মধ্য দিয়ে ৬০ দিনের মধ্যে একটি স্থায়ী চুক্তি করার যে সম্ভাবনা ছিল, তা এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
গত ১৭ জুন ফ্রান্সের ভার্সাইয়ে এক নৈশভোজের পর ট্রাম্প ও ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। শর্ত অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখা এবং ইরানকে শত কোটি ডলারের তেল বিক্রির অনুমতি দেওয়ার কথা ছিল। ট্রাম্প পরে এক সাক্ষাৎকারে এটিকে 'ইরানের জন্য দারুণ একটি চুক্তি' বলে আখ্যা দেন এবং মধ্যস্থতাকারীদের 'গর্বিত' বলেও মন্তব্য করেন। তবে চুক্তির এক মাসও পূর্ণ না হতেই প্রণালিতে জাহাজ হামলার ঘটনা ঘটে, যার জন্য ইরানের নিয়ন্ত্রণের বাইরের এলাকাকে দায়ী করা হয়।
এর জেরে ট্রাম্প প্রশাসন পুনরায় কঠোর অবস্থানে ফিরে আসে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, ইরান যদি জাহাজে গুলি চালায় তবে তাদের 'নরক' দেখানো হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই কৌশল দীর্ঘমেয়াদে ফলপ্রসূ হবে না। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক রিচার্ড এন হাসের মতে, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে কৌশলগত অচলাবস্থায় রয়েছে। তিনি বলেন, বেশি হামলার অর্থ ইরানের পাল্টা হামলা, আর প্রশাসন উপসাগরীয় স্থাপনা রক্ষার উপায় এখনো বের করতে পারেনি।
এদিকে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন দিন দিন প্রকট হচ্ছে। নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিকে পাথর নিক্ষেপ ও অভিশাপ দেয়া হয়। তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মাথা নত করার অভিযোগ তোলা হয়। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকেও ক্ষুব্ধ জনতার হাত থেকে নিরাপত্তারক্ষীদের সহায়তায় সরিয়ে নিতে হয়। ট্রাম্প অবশ্য ইরানের এই বিভাজন নিয়ে খুব বেশি কথা বলেন না। তিনি সম্প্রতি নতুন নেতৃত্বকে 'বাজে লোক' বলে মন্তব্য করেছেন, যদিও কয়েক সপ্তাহ আগে তাঁদের 'যুক্তিমনস্ক' বলেছিলেন।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ চুক্তির একটি অস্পষ্ট অনুচ্ছেদ থেকেই উদ্ভূত হয়েছে। সমঝোতা স্মারকের পঞ্চম অনুচ্ছেদে বলা হয়, ইরান ৬০ দিনের জন্য জাহাজ চলাচলে কোনো মাশুল নেবে না এবং নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করবে। ট্রাম্প প্রশাসন এটিকে ইরানের দায়িত্ব হিসেবে দেখলেও, ইরান এটিকে প্রণালি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। তারা জোর দেয় জাহাজগুলোকে তাদের উপকূলের কাছের চ্যানেল দিয়ে যেতে হবে এবং শেষ পর্যন্ত মাশুল আরোপের ইঙ্গিত দেয়। মার্কিন নৌবাহিনী ওমানের কাছে ভিন্ন চ্যানেল ব্যবহার শুরু করলে ইরান কিছু জাহাজে গুলি চালায়। শিপিং প্রতিষ্ঠান লয়েডস অব লন্ডনের তথ্য অনুযায়ী, এখন প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, যুদ্ধবিরতি 'শেষ' হয়ে গেছে। তাঁর সহযোগীদের দাবি, ইরান চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। তবে সামনের দিকে তাকালে কোনো স্পষ্ট 'প্ল্যান সি' নেই বলে মনে হচ্ছে। প্রশাসন 'কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা' চালিয়ে যাওয়ার কথা বললেও, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও প্রণালি নিয়ন্ত্রণের মতো রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে নিম্নস্তরের কর্মকর্তাদের ক্ষমতা নেই। অন্যদিকে ইরানের অনেকে যেকোনো কূটনৈতিক সমাধানকে কেবল একটি সাময়িক স্থিতাবস্থা হিসেবে দেখছেন। ফলে সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।




