সেন্ট মার্টিন দ্বীপের সৈকতগুলোতে রাতের অন্ধকারে কেয়াগাছ পুড়িয়ে ফেলার ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। স্থানীয়রা জানান, সমুদ্রের দৃশ্য উন্মুক্ত করে দিয়ে পর্যটন ব্যবসা প্রসারের জন্যই এই ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হচ্ছে। ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের বালিয়াড়ি ক্ষয়, জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি এবং জীববৈচিত্র্যের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।

গত ৮ ও ৯ আগস্ট দ্বীপের পূর্বপাড়া, গলাচিপা, দক্ষিণপাড়া, কোনারপাড়া ও উত্তরপাড়া এলাকার সৈকত ঘুরে এমন চিত্র দেখা যায়। সরু ইটের রাস্তার পাশে দীর্ঘ শিকড় ছড়ানো কেয়াগাছের সারি আগুনে পুড়ে গেছে। কোথাও কোথাও প্রাকৃতিক এই প্রাচীরের বড় অংশ নষ্ট হয়ে গেছে, যার ফলে উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে সাগরের নীল জলরাশি। একটি এলাকায় প্রায় এক কিলোমিটার কেয়াবন সম্পূর্ণ বিলুপ্ত এবং পাশের অর্ধ কিলোমিটার বনের অন্তত ৩০০ কেয়াগাছ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ধ্বংস হওয়া গাছের কঙ্কালসার দৃশ্য এখনো সেখানে বিদ্যমান।

স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ জানান, গভীর রাতে দুর্বৃত্তরা কেয়াবনে আগুন ধরিয়ে দেয়। ফলে মুহূর্তেই শত শত গাছ পুড়ে ছাই হয়ে যায়। দক্ষিণপাড়া, দিয়ারমাথা, পশ্চিমপাড়া ও কোনারপাড়া সৈকতেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। হোটেল, রিসোর্ট বা গেস্টহাউস থেকে অতিথিরা যেন সরাসরি সমুদ্র দেখতে পারেন, সেজন্যই এই কাণ্ড করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম।

দ্বীপের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকার ‘সেন্ট মার্টিন দ্বীপের জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অভিযোজন প্রকল্প’ নামে প্রায় ৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের আওতায় এ বছর সৈকততীর ও বালিয়াড়িতে আড়াই হাজার কেয়া চারা রোপণ করা হয়েছে এবং আরও তিন হাজার চারা রোপণের কাজ চলছে। প্রকল্প পরিচালক কামরুল হাসান বলেন, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে বালিয়াড়িকে রক্ষা করার একমাত্র প্রাকৃতিক ঢাল হলো কেয়াবন। এর শিকড় মাটির গভীরে ছড়িয়ে বালুকে শক্তভাবে আটকে রাখে। অতীতে হোটেল-রিসোর্ট নির্মাণের কারণে কেয়াবন বিলুপ্ত হলেও সরকার এখন নতুন করে তা সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছে।

দ্বীপের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান নুর আহমদ জানান, কেয়াবন ধ্বংসের কারণে সৈকতের বালিয়াড়ি ধসে পড়ছে এবং নারকেলগাছগুলো উপড়ে পড়ছে। জোয়ারের পানি এখন সরাসরি বসতবাড়িতে আঘাত হানছে। দ্বীপের উত্তরাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের ৮ কিলোমিটার কেয়াবনের কিছু অংশ নিধন করা হচ্ছে। বাইরের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা প্রথমে জমি কিনে গাছ কেটে বা পুড়িয়ে সেখানে পাকা অবকাঠামো নির্মাণ করছেন। সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান জানান, পুরো দ্বীপে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ছয় হাজার নারকেলগাছ এখন অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে, যা এক দশক আগেও ছিল দ্বিগুণ।

প্রসঙ্গত, ১৯৯৯ সালে সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ ঘোষণা করা হয়। সর্বশেষ ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে সেন্ট মার্টিনসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের ১ হাজার ৭৪৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা হয়। ইসিএ আইন অনুযায়ী সেখানে মাটির পরিবর্তন, অবকাঠামো নির্মাণ, কেয়াবন ধ্বংস, গাছ কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আইন অমান্য করলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান থাকলেও বাস্তবে তা প্রয়োগ হচ্ছে না। গত আড়াই বছরে দ্বীপে ৮০টির বেশি অবৈধ রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁ গড়ে উঠেছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে পর্যটক যাতায়াত সীমিত করে অন্তর্বর্তী সরকার। ১ নভেম্বর থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত তিন মাস প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটক দ্বীপে যেতে পারছেন। গত দুই মৌসুমে ২ লাখ ৩৭ হাজার পর্যটক সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ করেছেন, যা তিন বছর আগের তুলনায় অর্ধেকের কম। পরিবেশের কিছুটা উন্নতি হলেও কেয়াবন রক্ষা করা যাচ্ছে না। গত ৮ আগস্ট প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম সেন্ট মার্টিন সফরের সময় কেয়াবন ধ্বংস ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে কঠোর পদক্ষেপের নির্দেশ দেন। পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা জানান, কেয়াগাছ কর্তন ও সৈকত দখলের অভিযোগে ১৪টি রিসোর্টের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। আগামী ১ নভেম্বর পর্যটন মৌসুম শুরু হলে ঘটনাস্থলে গিয়ে দুর্বৃত্তদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে।