দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়টি সাধারণত মানুষের নানা অভিযোগ ও আবেদনের জন্য পরিচিত। কিন্তু সপ্তাহের নির্দিষ্ট একটি দিন এখন যেন দ্বিতীয় পাঠশালায় পরিণত হয়েছে এক স্কুলছাত্রীর জন্য। মাসিমপুর সরকারপাড়ার বাসিন্দা সাদিয়া আফরিন গত এক বছর ধরে প্রতি বুধবার সেখানে উপস্থিত হচ্ছে, তবে তার হাতে থাকে না কোনো অভিযোগের কাগজ, থাকে সপ্তাহজুড়ে করা পড়ার খাতা।

অভাবের সংসারে তিন মেয়েকে নিয়ে দিনাতিপাত করা সেলিম-আরফা দম্পতির বড় মেয়ে সাদিয়ার পড়াশোনার খরচ চালানো দুর্বিষহ হয়ে উঠছিল। বাবা সেলিম একটি চালকলের শ্রমিক, আর মা আরফা বেগম সংসারের ফাঁকে সেলাইয়ের কাজ করেন। সংসারের সীমিত আয়ে মেয়ের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে না পেরে গত বছরের জুলাইয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে আর্থিক সহায়তার আবেদন করেন আরফা বেগম। এক সপ্তাহ পর মেয়েকে নিয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করতে গেলে ঘটে যায় অন্য এক ঘটনা।

প্রত্যাশা ছিল আর্থিক সাহায্য মিলবে, কিন্তু জেলা প্রশাসক রফিকুল ইসলাম সেদিন তাৎক্ষণিক কোনো টাকা-পয়সা দেননি। বরং সাদিয়ার পড়াশোনার বিষয়ে নানা প্রশ্ন করে দেখতে চান তার আগ্রহ কতটুকু। প্রথম দিনের কথোপকথনেই তিনি বুঝতে পারেন মেয়েটির মধ্যে পড়ার প্রতি অসাধারণ আগ্রহ রয়েছে। তখনই তিনি সাদিয়াকে একটি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন — এক সপ্তাহের নির্দিষ্ট পড়া দিয়ে বলেন, পরের সপ্তাহে এসে তা বুঝিয়ে দিতে হবে। সাথে ঠিক করে দেন দৈনন্দিন রুটিনও। রাতে দুই ঘণ্টা আর ভোরে দুই ঘণ্টা পড়া, রাত ১০টায় ঘুম আর ভোর ৫টায় ওঠা, বিকেলে এক ঘণ্টা খেলাধুলা এবং প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া — এই ছিল ডিসির নির্ধারিত সময়সূচি। রুটিন মেনে চললে চার মাস পর আর্থিক সহায়তার আশ্বাসও দেন তিনি, যদিও পরের মাসেই সাদিয়ার হাতে পৌঁছে যায় সাত হাজার টাকা।

এরপরই শুরু হয় সাদিয়ার নিয়মিত যাত্রা। প্রতিটি বুধবার গণশুনানির দিন সকালে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে হাজির হতো সে। মানুষের অভিযোগ শোনার ফাঁকে ফাঁকে ডিসি সাহেব শুনে নিতেন সাদিয়ার পড়া, ভুল হলে সংশোধন করে দিতেন, আবার নতুন পড়া দিয়ে বিদায় করতেন। প্রথম দিকে ডিসি স্যারের কাছে পড়া দিতে ভয় পেলেও ধীরে ধীরে তা অভ্যাসে পরিণত হয়। শুধু পড়া শোনাই নয়, নিজের মেয়ের মতো খোঁজখবরও রাখতেন তিনি। এই নিয়ম চলতে থাকে সপ্তাহ থেকে মাস, মাস থেকে এক বছর।

গত ১০ আগস্ট প্রকাশিত এসএসসি ফলাফলে দেখা যায়, স্থানীয় কাদের বকস মেমোরিয়াল হাই স্কুলের শিক্ষার্থী সাদিয়া আফরিন বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। এবারের পরীক্ষায় বিদ্যালয়টির ৪৩ জন অংশগ্রহণের মধ্যে পাস করেছে ২২ জন, আর একমাত্র সাদিয়াই সর্বোচ্চ ফল অর্জন করেছে। খবরটি ছড়িয়ে পড়লে আনন্দে ভরে ওঠে সেলিম-আরফা দম্পতির ঘর। গত বৃহস্পতিবার পরিবারটি ছুটে যায় জেলা প্রশাসকের কাছে, সেখানে সাদিয়াকে অভিনন্দন জানানো হয় এবং মিষ্টিমুখ করানো হয়।

মেয়ের এই সাফল্যে আবেগাপ্লুত মা আরফা বেগম জানান, বই কেনার জন্য আর্থিক সাহায্য চেয়ে আবেদন করেছিলেন তিনি। ডিসি স্যার শুধু টাকা দিয়েই সহায়তা করেননি, মেয়েকে নিয়মিত পড়া দিয়েছেন, পড়া নিয়েছেন এবং খোঁজখবর নিয়েছেন বলেই আজ এই ভালো ফল সম্ভব হয়েছে। তবে আনন্দের পাশাপাশি বাবা সেলিমের কণ্ঠে ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা। মেয়ে অনেক দূর পর্যন্ত পড়তে চায়, কিন্তু নিজের সামর্থ্য নিয়ে তিনি শঙ্কিত। সাদিয়ার স্কুলের প্রধান শিক্ষক মকসেদ আলী বলেন, জেলা প্রশাসক প্রায়ই স্কুলে আসেন এবং ক্লাস নেন। সাদিয়াকে নিজের মেয়ের মতো দেখতেন বলেও জানান তিনি।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রথম দিন কথা বলে সাদিয়ার মধ্যে পড়ার আগ্রহ টের পান তিনি। তারপর তাকে চ্যালেঞ্জটি দেওয়া হয়, যা সে সত্যিই মেনে চলেছে। তিনি আরও বলেন, দিনাজপুরের বেশ কিছু স্কুল ঘুরে দেখা গেছে এমন অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী রয়েছে যাদের কাগজ-কলম পর্যন্ত কেনার সামর্থ্য নেই। গত দেড় বছরে জেলা প্রশাসন থেকে কিছু মেধাবী শিক্ষার্থীকে সহায়তা এবং প্রতিবছর নির্দিষ্ট সংখ্যক শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দেওয়ার কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। সাদিয়া আফরিন জানায়, প্রথম দিকে ডিসি স্যারের কাছে পড়া দিতে ভয় পেলেও নিয়মিত পড়া করত সে। আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি স্যারের দেওয়া সাহস তাকে অনেক এগিয়ে নিয়েছে। ভবিষ্যতে সে সরকারি চাকরি করে পরিবারের অভাব দূর করতে চায়।