ডালাসের সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে স্পেন যেভাবে খেলার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল, তাকে বার্তা সংস্থা রয়টার্স আখ্যা দিয়েছে ‘অ্যানাকোন্ডা গ্রিপ’ হিসেবে। এই কৌশল যেন দক্ষিণ আমেরিকার অ্যানাকোন্ডা সাপের মতো শিকারকে পেঁচিয়ে ধরে দম আটকে দেওয়ার প্রক্রিয়া। স্প্যানিশ মিডফিল্ড ও ডিফেন্স এমন নিবিড় চাপ তৈরি করেছিল যে ফরাসি খেলোয়াড়দের পাসের পথগুলো ক্রমশ সরু হয়ে এসেছে। মাইকেল ওলিসে ও অঁরেলিয়ে চুয়ামেনিদের পাসের প্রবাহ বন্ধ করে দিয়েছেন রদ্রি, পাউ কুবারসি এবং মার্ক কুকুরেয়ারা। ফলে বেশিরভাগ সময় মাঝমাঠ থেকে বল পেতে হাঁসফাঁস করতে হয়েছে কিলিয়ান এমবাপ্পে ও উসমান দেম্বেলেদের মতো তারকাদের।

সেমিফাইনালের আগে ফ্রান্সের আক্রমণভাগকে থামানোর কোনো উত্তর কারও কাছে ছিল না, কিন্তু স্পেন অনেক আগেই প্রস্তুতি সেরে রেখেছিল বলে জানান স্প্যানিশ ফুটবল বিশেষজ্ঞ গিলেম বালাগ। তার মতে, লুইস দে লা ফুয়েন্তে এক দশক আগে থেকেই ওইয়ারসাবাল, রদ্রি, ওলমোদের নিয়ে এই অভিযাত্রার ভিত রচনা করেছিলেন। অনূর্ধ্ব-১৯ ও অনূর্ধ্ব-২১ স্তরে একসাথে খেলা এই চক্রের বোঝাপড়ার ফসল হিসেবে সেমিফাইনালে দেখা গেছে অনবদ্য দলীয় নৈপুণ্য। বালাগের ভাষায়, ম্যাচের প্রতিটি উপাদান ছিল সম্পূর্ণরূপে স্পেনের নিয়ন্ত্রণে এবং এই প্রদর্শনী ফুটবল শেখার প্রতিটি একাডেমিতে উদাহরণ হিসেবে দেখানো উচিত।

স্পেনের এই শ্বাসরোধী কৌশলের জালে কীভাবে ফ্রান্স ফেঁসেছে তা ব্যাখ্যা করেছেন স্বয়ং এমবাপ্পে। ফরাসি সম্প্রচারক ‘এম৬’কে তিনি স্বীকার করেন যে কৌশলগত কিংবা সামগ্রিক পারফরম্যান্স—কোনো দিক থেকেই তারা প্রত্যাশিত মানে পৌঁছাতে পারেননি। তাদের পরিকল্পনা ছিল ওপর থেকে উচ্চচাপ সৃষ্টি করে স্পেনের ধীরগতির ও নিয়ন্ত্রিত ছন্দ নষ্ট করা, কিন্তু তা বাস্তবায়নে তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। এমবাপ্পে আরও বিশ্লেষণ করে বলেন, মাঝমাঠে চুয়ামেনি ও আদ্রিয়ান রাঁবিও বারবার দুইজনের বিপরীতে তিনজনের অসহায় অবস্থায় পড়েছেন, যা স্পেনের মতো দলের বিপক্ষে বিশাল এক সমস্যা তৈরি করেছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলতে না পারার কারণ বিশ্লেষণ করে বালাগ বলেছেন, স্পেন নিজেদের শক্তির জায়গাগুলো চিহ্নিত করে—যেমন বল পজিশন ধরে রাখা, ম্যাচ পরিস্থিতি বোঝা এবং টেকনিক্যাল দক্ষতা—সেই অনুযায়ী কোচ ও খেলোয়াড় নির্বাচন করেছিল। রদ্রি, ওলমো এবং রুইজরা সেই ছাঁচে নিখুঁতভাবে ফিট হয়েছেন।

এমবাপ্পের জন্য এই হার গভীর হতাশার হলেও, কোচ দে লা ফুয়েন্তের জন্য তা এক দীর্ঘ প্রতীক্ষিত স্বপ্নপূরণ। তিনি জানান, প্রায় চার বছর আগে একটি নির্দিষ্ট দর্শন নিয়ে তারা যাত্রা শুরু করেছিলেন এবং সেই দর্শনে অবিচল থাকাই তাদের এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। নিজেদের প্রায় অজেয় মনে হওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করে তিনি খেলোয়াড়দের একাগ্রতা, উদারতা ও প্রতিভার ভূয়সী প্রশংসা করেন।

২-০ গোলের এই জয়ে ফাইনালে ওঠা স্পেনের সামনে এখন অপেক্ষা করছে আর্জেন্টিনা অথবা ইংল্যান্ডের মধ্যে জয়ী দল। নিউ জার্সিতে আগামী রোববার রাতে অনুষ্ঠিত হবে বহুল প্রতীক্ষিত এই বিশ্বকাপ ফাইনাল।