সুইডিশ ফার্নিচার জায়ান্ট ইকিয়া তাদের ব্যবসায়িক মডেলে এক অভিনব পরিবর্তন এনেছে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) পাশাপাশি মানুষের দক্ষতাকে আরও বেশি মূল্যায়ন করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এআই যুগে স্বয়ংক্রিয়তা যেখানে অনেক কোম্পানির জন্য খরচ কমানোর হাতিয়ার, সেখানে ইকিয়া সেটিকে ব্যবহার করছে মানুষের কাজের সুযোগ বাড়াতে এবং উচ্চমূল্যের সেবা প্রদানে।

২০২১ সালে ইকিয়া তাদের এআই-চালিত গ্রাহকসেবা বট 'বিলি' চালু করে, যা বিলি বুকশেলফের নামে নামকরণ করা হয়েছে। এই বটটি সাধারণ এবং পুনরাবৃত্তিমূলক প্রশ্ন যেমন 'ইকিয়া কখন খোলে?' বা 'দোকানে কি পোষা প্রাণী আনা যায়?'—এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর দিতে সক্ষম। প্রথম দুই বছরে এটি ৪৭% গ্রাহকের সহায়তা করতে পেরেছিল, যা এখন বেড়ে ৭৪% হয়েছে। এই স্বয়ংক্রিয়তা সত্ত্বেও ইকিয়া কল সেন্টারের কর্মীদের ছাঁটাই না করে তাদের পুনরায় প্রশিক্ষণ দিয়েছে। প্রায় ৮,৫০০ কর্মীকে জটিল গ্রাহক প্রশ্ন সমাধান বা ইন্টেরিয়র ডিজাইন পরামর্শক হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে।

ইকিয়ার এই 'রিস্কিলিং' উদ্যোগের কেন্দ্রে রয়েছে হেলসিংবার্গ, শেফিল্ডসহ ২৪টি রিমোট সেলস সেন্টার। এই সেন্টারগুলো গত তিন বছরে ইকিয়ার সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল বিক্রয় চ্যানেলে পরিণত হয়েছে, যেখানে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ১৫% থেকে ২০%। গত অর্থবছরে এই সেন্টারগুলোর মাধ্যমে ১.২৫ বিলিয়ন ইউরো (প্রায় ১.৩৭ বিলিয়ন ডলার) বিক্রয় হয়েছে, যা আগের বছরের ১.০৮ বিলিয়ন ইউরো থেকে বেশি। পাশাপাশি, গ্রাহক সন্তুষ্টি সূচক (সিএসএটি) বিলি চালুর আগে ৬০% থেকে বেড়ে এখন ৮৯% হয়েছে।

ইকিয়ার ব্যবসায়িক কৌশল বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। হোয়ার্টনের অধ্যাপক প্রসন্ন তাম্বে মনে করেন, পুনরায় দক্ষতা অর্জনের মূল চাবিকাঠি হলো কর্মীদের বিদ্যমান জ্ঞানকে নতুন এবং আরও কার্যকর উপায়ে ব্যবহার করা। তিনি বলেন, 'কোম্পানিগুলো দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকের প্রয়োজন মেটাতে মানুষ ব্যবহার করছে। প্রশ্ন হলো, এই মানুষগুলোকে কি গ্রাহকের চাহিদা পূরণের দিকে সরানো সম্ভব?' ইকিয়া সেটাই করছে—গ্রাহকের অভিযোগ শোনা থেকে শুরু করে পণ্য বিক্রির সুযোগ তৈরি করা পর্যন্ত সবকিছুই এখন মানবিক দক্ষতার ওপর ভর করছে।

পুনরায় প্রশিক্ষণের প্রক্রিয়াটি প্রায় দুই বছর সময় নিয়েছে। কর্মীরা অনলাইন এবং শ্রেণিকক্ষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ইকিয়ার ডিজিটাল রুম-প্ল্যানিং টুল ব্যবহারে দক্ষ হয়ে ওঠেন। তারা প্রশিক্ষণ নেন কীভাবে সঠিক প্রশ্ন করতে হয়—ঘরের মাপ, রঙের পছন্দ থেকে শুরু করে মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্ন যেমন 'ঘরটিতে কী কাজ করছে না?' বা 'আপনি কেমন অনুভব করছেন?' নতুন কর্মীদের জন্য এই প্রশিক্ষণের সময় পাঁচ থেকে ছয় সপ্তাহ।

শেফিল্ডের রিমোট সেলস সেন্টারের কর্মী রিচার্ড রিচার্ডসন জানান, বিলি বট চালুর পর তিনি কখনো চাকরি হারানোর আশঙ্কা অনুভব করেননি। তিনি দুই সপ্তাহের 'কিচেন স্কুল' সহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ মডিউল সম্পন্ন করেছেন এবং কাছের ইকিয়া স্টোরে গিয়ে কাউন্টারটপ নিয়ে সরাসরি পড়াশোনা করেছেন। তিনি বলেন, 'এআই নিয়ম-কানুন ভালো জানে, কিন্তু গ্রাহককে কী অফার করা হয়েছে এবং সমস্যা সমাধানের জন্য কী করা যায়—এটা বুঝতে পারে না।' এছাড়াও, তার দলের মূল লক্ষ্য গ্রাহকের সমস্যা সমাধান করা হলেও, তারা কলকারীদের বিনামূল্যে ডেলিভারির সময় অতিরিক্ত আইটেম অর্ডার করার সুযোগ দিয়ে বিক্রয় বাড়ানোর চেষ্টা করেন।

ইকিয়ার এই উদ্যোগটি এমন এক সময়ে এসেছে যখন ফ্ল্যাট-প্যাক ব্যবসায় প্রতিযোগিতা বাড়ছে। ওয়েফেয়ার, অ্যামাজন এবং আর্টিকেলের মতো ব্র্যান্ডের চাপ মোকাবিলায় ইকিয়া সাশ্রয়ী মূল্যের ওপর জোর দিচ্ছে। তবে ইংকা গ্রুপ এবং ইন্টার ইকিয়া গ্রুপ কর্পোরেট কর্মীদের ছাঁটাই করলেও রিমোট সেলস সেন্টারগুলোতে কোনো ছাঁটাই হয়নি। ইংকা গ্রুপের চিফ ডিজিটাল অফিসার পারাগ পারেখ বলেন, ভবিষ্যতে ছাঁটাই হতে পারে, তবে তা মূলত সামষ্টিক অর্থনৈতিক কারণেই হবে, এআই-এর কারণে নয়।

গ্রাহকরা এখনও ইকিয়ার ওয়েবসাইটে বিনামূল্যে আংশিক স্বয়ংক্রিয় ডিজাইন টুল ব্যবহার করতে পারেন, কিন্তু অনেকে এখনও মানবিক ডিজাইন পরামর্শকের সাহায্য নিতে পছন্দ করেন। গত অর্থবছরে ইকিয়ার কর্মীরা রিমোট সেলস সেন্টারের মাধ্যমে ১ কোটি গ্রাহককে সহায়তা করেছেন। বড় ধরনের বাড়ি সংস্কার বা জটিল ডিজাইনের ক্ষেত্রে গ্রাহকরা বটের চেয়ে মানুষের মতামতকেই বেশি মূল্য দেন। যেমনটি হেলসিংবার্গ সেন্টারের সিনিয়র সেলস স্পেশালিস্ট ম্যাডেলিন বার ব্যাখ্যা করেন, গ্রাহকরা জানতে চান যে কোনো উপাদান দিয়ে তৈরি কাউন্টারটপ স্পর্শে কেমন লাগে বা কোনো নব ঘুরালে কেমন শব্দ হয়—এমন প্রশ্নের উত্তর বিলি বট কখনো দিতে পারবে না বলে ধারণা করা হয়।