মহাকর্ষ বলের সঙ্গেই আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে বেশি সম্পর্ক। এটি আমাদের পা মাটিতে আটকে রাখে, সূর্যকে কক্ষপথে ধরে রাখে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বলটির শক্তি কতটুকু, তার কোনো নিখুঁত মান আজ পর্যন্ত নির্ণয় করতে পারেননি বিজ্ঞানীরা। ১৯৮০-এর দশক থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত ডজনখানেকের বেশি পরীক্ষা চালানো হয়েছে, কিন্তু প্রতিবারই ফলাফলে দেখা গেছে সামান্য কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ পার্থক্য। প্রশ্ন হলো, কেন এত বছর পরও মহাকর্ষের প্রকৃত জোর মাপা সম্ভব হচ্ছে না?

সবচেয়ে বড় বাধা হলো মহাকর্ষ বলের প্রচণ্ড দুর্বলতা। আমরা পৃথিবীর টান প্রতিনিয়ত অনুভব করি বলে এটি শক্তিশালী মনে হয়। কিন্তু বাস্তবে, পরীক্ষাগারের দুটি ছোট বস্তুর মধ্যকার মহাকর্ষ বল এতই ক্ষীণ যে তা মাপা প্রায় অসম্ভব। বিষয়টি বোঝার জন্য একটি সহজ উদাহরণ দেওয়া যাক: একটি ছোট চুম্বক দিয়ে টেবিল থেকে একটি লোহার আলপিন তোলা যায়। অথচ পুরো পৃথিবীর বিশাল ভরের মহাকর্ষ বল সেই আলপিনকে নিচে টানছে, কিন্তু ছোট চুম্বকটি সহজেই সেই টানকে অতিক্রম করে ফেলে। এটি প্রমাণ করে, অন্যান্য মৌলিক বলের তুলনায় মহাকর্ষ কতটা দুর্বল।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেকনোলজির পদার্থবিদ স্টেফান শ্লেমিঙ্গার ও তার দল একটি বিশাল পরীক্ষা চালান। তারা ১৩ টন পারদ ব্যবহার করেন—যা প্রায় দুটি পূর্ণবয়স্ক হাতির ওজনের সমান। এই বিপুল ভর ব্যবহার করেও দেখা গেল, পারদের স্তূপগুলোর মধ্যকার মহাকর্ষ বলের পরিবর্তন পৃথিবীর নিজস্ব মহাকর্ষের তুলনায় মাত্র দশ লাখ ভাগের এক ভাগ। এই পরীক্ষায় তারা মহাকর্ষ ধ্রুবকের মান পেয়েছেন ৬.৬৭৩৮৭ × ১০⁻¹¹ মিটার³.কেজি⁻¹.সেকেন্ড⁻², যা আগের গৃহীত মানের চেয়ে ০.০২৩৫% কম। এই সামান্য পার্থক্য বিজ্ঞানের জগতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। জার্মান ন্যাশনাল মেট্রোলজি ইনস্টিটিউটের পদার্থবিদ ক্রিস্টিয়ান রথলেইটনার এই প্রসঙ্গে বলেন, মহাকর্ষের এই অতি ক্ষুদ্র বলকে দশমিকের পর অন্তত ছয় ঘর পর্যন্ত নিখুঁতভাবে মাপা প্রয়োজন—যা মানবদেহের মাত্র ৭টি কোষের ওজন মাপার চেষ্টার সমতুল্য।

শ্লেমিঙ্গার একে মজার ছলে 'পিইপি' বা পদার্থবিজ্ঞান, ইঞ্জিনিয়ারিং ও মনস্তত্ত্ব—এই তিনটি সম্ভাব্য কারণের কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, পদার্থবিজ্ঞানের দিক থেকে বলা যায়, মহাকর্ষের এমন কোনো অজানা নিয়ম থাকতে পারে যা আমরা এখনো আবিষ্কার করিনি। ঠিক যেমন নিউটনের সূত্রকে বদলে দিয়েছিল আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব। দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তিগত কারণে ভিন্ন ভিন্ন পরীক্ষায় ভিন্ন যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়—কেউ টর্শন ব্যালেন্স, কেউ দোলক, আবার কেউ বস্তু ফেলে দিয়ে পরিমাপের চেষ্টা করেন। প্রতিটি যন্ত্রের নিজস্ব ভুলের ধরন থাকে, যা মূল সংকেত থেকে আলাদা করা কঠিন। তৃতীয় এবং সবচেয়ে জোরালো কারণ হিসেবে তিনি মনস্তাত্ত্বিক চাপকে চিহ্নিত করেন। বিজ্ঞানীদের ওপর নিখুঁত ফলাফল দেওয়ার চাপ থাকে; ভুলের মাত্রা যত কম দেখানো যায়, তারা তত বেশি সম্মান পান। এই চাপের কারণে গবেষকেরা অবচেতনভাবে তাদের ভুলের মাত্রাকে বাস্তবের চেয়ে কমিয়ে দেখান, যার ফলে এক পরীক্ষার সঙ্গে আরেক পরীক্ষার ফল মেলে না।

তবে দৈনন্দিন ও মহাকাশ গবেষণার কাজে মহাকর্ষ ধ্রুবকের অতি-নিখুঁত মান না জানলেও কোনো সমস্যা হয় না। পৃথিবীর ভর ও মহাকর্ষীয় ধ্রুবকের গুণফল জানা থাকায় রকেট উৎক্ষেপণ সম্ভব। রথলেইটনারের ভাষায়, এটি মূলত তাত্ত্বিক আগ্রহের বিষয়। প্রয়োজনে বিশ্বের বড় দেশগুলো আগেই নিখুঁত মান নির্ণয়ে উদ্যোগী হতো। তবুও শ্লেমিঙ্গারের কাছে এটি রোমাঞ্চকর। তিনি মনে করেন, আমরা ভাবি সব আবিষ্কার হয়ে গেছে, কিন্তু বিজ্ঞানে এখনো অনেক অজানা সীমানা রয়েছে। ছোট সমস্যা সমাধানের আনন্দই অনন্য।