কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্বিতীয় অধ্যায়ে আর শুধু শক্তিশালী মডেল তৈরি যথেষ্ট নয়—এখন মূল প্রশ্ন হলো, কে সেই প্রযুক্তিকে উৎপাদনশীলতায় রূপান্তরিত করতে পারবে। বিশ্ব অর্থনীতি এখন সেই ক্রান্তিকালে পৌঁছেছে যেখানে লড়াইটি প্রযুক্তির দখল নিয়ে নয়, বরং সেই প্রযুক্তিকে কাজে লাগানোর দক্ষতা, নেতৃত্ব ও অবকাঠামো নিয়ে। দক্ষিণ ইউরোপে এই পরিবর্তন ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। গ্রিস, পর্তুগাল, ইতালিসহ এই অঞ্চলের দেশগুলো এখন নিছক এআই টুল ব্যবহারের বদলে একটি সমন্বিত ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে চাইছে, যেখানে মানব সম্পদ, বিশ্ববিদ্যালয়, স্টার্টআপ, সরকারি খাত এবং আধুনিক ডিজিটাল অবকাঠামো একসঙ্গে কাজ করবে।
মাইক্রোসফটের দক্ষিণ ইউরোপ বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট চার্লস ক্যালেস্ট্রোপ্যাট ফরচুন গ্রিসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, তিনি গ্রিসকে কেবল একটি বাজার হিসেবে নয়, বরং একটি উদ্ভাবন হাব হিসেবেই দেখেন। তাঁর দায়িত্বে থাকা ১৭টি বাজারের মধ্যে গ্রিস এখন এআই হাবে পরিণত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অনেক উপাদানই ধারণ করছে বলে মনে করেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে পরিণত উদ্ভাবন ইকোসিস্টেম, mAigov-এর মতো সরকারি ডিজিটাল উদ্যোগ, ক্লাউড ও ডেটা সেন্টারে ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে সঠিক দক্ষতাসম্পন্ন জনশক্তি।
দক্ষতাই যদি এই পরিবর্তনের ভিত্তি হয়, তাহলে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই লক্ষ্যেই মাইক্রোসফট তাদের GR for GRowth উদ্যোগের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ১ লাখ মানুষকে ডিজিটাল দক্ষতা প্রশিক্ষণ দিয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি খাতের পেশাজীবী, শিক্ষার্থী এবং বেকার—সবাই এই প্রশিক্ষণের আওতায় এসেছেন। এই কৌশলের মূল উদ্দেশ্য শুধু ডিজিটাল রূপান্তর ত্বরান্বিত করাই নয়, বরং কেউ যেন পেছনে না পড়ে থাকে সেটিও নিশ্চিত করা।
ইউরোপে জেনারেশন জেডের মধ্যে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে গ্রিসের অবস্থান প্রথম। তবে ক্যালেস্ট্রোপ্যাটের মতে, সবকিছু নির্ধারিত হবে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের পদ্ধতি পুনর্নির্মাণ, কর্মীদের দক্ষতায় বিনিয়োগ এবং এআই থেকে পরিমাপযোগ্য ব্যবসায়িক মূল্য তৈরি করার আস্থা অর্জনের সক্ষমতার ওপর। ২০২৫ সালের ওয়ার্ক ট্রেন্ড ইনডেক্স রিপোর্ট বলছে, বিশ্বব্যাপী ৪৬ শতাংশ প্রতিষ্ঠান এআই এজেন্টের মাধ্যমে কর্মপ্রবাহ স্বয়ংক্রিয় করছে এবং ৮২ শতাংশ নেতা আগামী ১২-১৮ মাসের মধ্যে সেগুলোকে যুক্ত করার পরিকল্পনা করছেন। তবে এখানে একটি ব্যবধান তৈরি হয়েছে—৬৭ শতাংশ নির্বাহী দাবি করেন তারা উন্নত এআই টুল সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, কিন্তু মাত্র ৪০ শতাংশ কর্মচারী এই বিষয়ে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। দক্ষিণ ইউরোপে এআই এজেন্টের সংযোজনকে উৎপাদনশীলতার ব্যবধান কাটিয়ে ওঠার সুযোগ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
ক্যালেস্ট্রোপ্যাট এআইকে নিছক সহায়ক হিসেবে নয়, বরং একটি সক্ষমতাকারী হিসেবে দেখতে বলেন। তিনি তিনটি ধাপের কথা উল্লেখ করেন—প্রথম ধাপে এআই কাজ সম্পন্ন করতে সহায়তা করে, দ্বিতীয় ধাপে এজেন্ট নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করে, আর তৃতীয় ধাপে মানব নিয়ন্ত্রণে এজেন্টদের একটি দল তৈরি হয়, যা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ মূল্য তৈরি করে। যেসব প্রতিষ্ঠান এআইয়ের ক্ষেত্রে শীর্ষে থাকতে চায় (ফ্রন্টিয়ার ফার্ম), তারা তিনটি বিষয় করে: কাজের নকশা পরিবর্তন, মূল ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ায় এআই প্রয়োগ এবং শক্তিশালী ডেটা গভর্নেন্স নিশ্চিত করা। সফল হতে হলে পরিমাপযোগ্য ব্যবসায়িক ফলাফল দেখাতে হবে এবং ডেটা সুরক্ষার সঙ্গে সম্মত থাকতে হবে বলে জানান তিনি।
তবে দক্ষিণ ইউরোপে এআই সংযোজনে বড় বাধা রয়েছে। ৬৫ শতাংশ মানুষ এআই রূপান্তরে পিছিয়ে পড়ার ভয়ে রয়েছেন, ৪৫ শতাংশ নিরাপদ অঞ্চলে থাকতে চান এবং মাত্র ১৩ শতাংশ মনে করেন তাঁদের প্রতিষ্ঠান ‘শেখা-পরীক্ষা-ব্যর্থতা’ মানসিকতাকে মূল্য দেবে। দক্ষিণ ইউরোপের বাজার মূলত ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের নিয়ে গঠিত, যেখানে দক্ষতার ঘাটতি প্রকট। ইন্টেলেকটিকার তথ্য অনুযায়ী, গ্রিসে ক্লাউড ও ডেভঅপস, সাইবার সিকিউরিটি, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং এবং এআই—এই খাতগুলোতে সবচেয়ে বড় দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। তবে এই পিছিয়ে থাকাকে সুযোগে রূপান্তরিত করা যেতে পারে বলে মনে করে সংস্থাটি, কারণ কর্মী ও প্রতিষ্ঠানগুলো চাহিদা বাড়ার আগেই নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধির সময় পাবে।
এদিকে দক্ষিণ ইউরোপে অবকাঠামোগত বিনিয়োগও জোরদার হচ্ছে। মাইক্রোসফট এথেন্সকে দক্ষিণ ইউরোপের কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক হাব হিসেবে উন্নীত করছে এবং পূর্ব আট্টিকায় ১ বিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগে তিনটি ডেটা সেন্টার নির্মাণ করছে, যা হবে দেশটিতে প্রতিষ্ঠানটির প্রথম সমন্বিত ক্লাউড অঞ্চল। এছাড়াও পিপিসি গ্রুপ ও আমিরাতের ডামাকের যৌথ উদ্যোগ এডিজিএনেক্স এবং মার্কিন প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল রিয়েলটি গ্রিসে বড় বিনিয়োগ করছে। পিমকোর সহযোগী অ্যাপটোও ৭৭০ মিলিয়ন ইউরোর হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার প্রকল্পের পরিকল্পনা করছে। এই সব বিনিয়োগ দক্ষিণ ইউরোপকে এআই বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এবং অঞ্চলটিকে একটি নতুন ডিজিটাল করিডোরে রূপ দিচ্ছে।




