বিশ্বকাপের মাঠে ‘প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’ পুরস্কারটি এখন ফুটবলের অন্যতম আলোচিত প্রসঙ্গ। সম্প্রতি বেলজিয়ামকে ২-১ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করার পর লামিনে ইয়ামাল যখন এই পুরস্কার গ্রহণ করেন, তাঁর চোখেমুখে উচ্ছ্বাসের বদলে ছিল উদাসীনতা। কিছুদিন আগে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষেও একই প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল তাঁর মধ্যে। যুক্তরাষ্ট্রের মালিক টিলমানও বসনিয়ার বিপক্ষে ম্যাচসেরা হওয়ার পর ক্যামেরার দিকে তাকাতে চাননি—যেন তিনি নিজেই জানতেন, এই পুরস্কারের জন্য আরও বেশি যোগ্য কেউ আছেন। এই ঘটনাগুলোই ফুটবলপ্রেমীদের মনে প্রশ্ন জাগিয়েছে—মাঠের সেরা খেলোয়াড় বেছে নেওয়ার এই আনুষ্ঠানিকতা কি এখন অর্থহীন হয়ে পড়েছে?
২০০২ সালের কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপে ফিফা প্রথম ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ পুরস্কার চালু করে। ২০২২ সালে লিঙ্গনিরপেক্ষতা বজায় রাখতে নাম বদলে হয় ‘প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’। প্রথম দুই সংস্করণে (২০০২ ও ২০০৬) এই পুরস্কারের বিচারক ছিলেন ফিফার ‘টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপ’-এর বিশেষজ্ঞরা। তখন ফুটবলের কৌশলগত দিক ও পারফরম্যান্সকেই প্রাধান্য দেওয়া হতো। কিন্তু ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ থেকে ফিফা এই সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের হাতে তুলে দেয়। এসএমএস ও অনলাইন ভোটের মাধ্যমে শুরু হয় নতুন অধ্যায়। ২০১৪ বিশ্বকাপে টুইটারে (বর্তমান এক্স) ভোট চললেও ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ থেকে পুরোপুরি ফিফার অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে স্থানান্তরিত হয়েছে এই প্রক্রিয়া। খেলা চলাকালীন যে কোনো সমর্থক যেকোনো খেলোয়াড়কে ভোট দিতে পারেন, এমনকি শেষ মুহূর্তে ভোট বদলের সুযোগও রয়েছে। এখানেই তৈরি হয়েছে সংকট—জনতার রায় আর পণ্ডিতের বিচার যেন দুই ভিন্ন পথে হাঁটছে।
পরিসংখ্যান ও প্রকৃত পারফরম্যান্সকে উপেক্ষা করে এই পুরস্কার এখন ‘জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতায়’ পরিণত হয়েছে। ২০২২ বিশ্বকাপে কানাডার বিপক্ষে ১-০ গোলে জয়ের পর বেলজিয়াম তারকা কেভিন ডি ব্রুইনা নিজেই বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিলেন, তিনি মনে করেন না তিনি কোনো অসাধারণ ম্যাচ খেলেছেন। তাঁর মতে, হয়তো নামের কারণেই তিনি এই ট্রফি পেয়েছেন। চলমান বিশ্বকাপেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। শেষ ৩২-এর লড়াইয়ে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ২-১ গোলের জয়ে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে ম্যাচসেরা ঘোষণা করা হলে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। ৪১ বছর বয়সী এই মহাতারকা ৬৮ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করলেও পুরো ম্যাচে প্রায় অদৃশ্যই ছিলেন। আর্জেন্টিনার ম্যাচেও একই ঘটনা ঘটে। কেপ ভার্দের বিপক্ষে ৩-২ গোলের শ্বাসরুদ্ধকর জয়ে লিওনেল মেসি পুরস্কার পান। মেসি প্রথম গোল করলেও লিসান্দ্রো মার্তিনেজ নিজে গোল ও অ্যাসিস্ট করেছিলেন। কেপ ভার্দের সিডনি কাবরালের অবিস্মরণীয় সমতাসূচক গোলটির অবদানও জনপ্রিয়তার আলোয় ঢাকা পড়ে যায়। আবার ঘানার বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ের ম্যাচে জুড বেলিংহাম ম্যাচসেরা হন, কিন্তু আফ্রিকান দলটির রক্ষণভাগের অসামান্য লড়াই কোনো স্বীকৃতিই পায়নি।
তা সত্ত্বেও মহাতারকাদের জয়রথ থামছে না। চলমান বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশিবার এই পুরস্কার জেতার রেকর্ডে সবার ওপরে আছেন লিওনেল মেসি। নিজের প্রথম ৫ ম্যাচের মধ্যে ৪টিতেই তিনি হয়েছেন ম্যাচসেরা। ৩টি করে ট্রফি নিয়ে তাঁর পেছনে আছেন জুড বেলিংহাম, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও আর্লিং হলান্ড। আর বিশ্বকাপের সামগ্রিক ইতিহাসে মেসি সব হিসাবের বাইরে—সর্বোচ্চ ১৫ বার এই ট্রফি উঠেছে তাঁর হাতে। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে, জনপ্রিয়তার কাছে পারফরম্যান্স কতটা ম্লান হয়ে যাচ্ছে।


