লক্ষ্মীপুর সদরের হামছাদী গ্রামের কৃষক মো. হাসানের মেয়ে ঢাকায় থাকেন। দীর্ঘদিন পর শ্বশুরবাড়ি থেকে বাবার বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন তিনি। লক্ষ্মীপুরের বিখ্যাত ইলিশের স্বাদ মেয়েকে খাওয়াবেন বলে আগেই মনস্থির করেছিলেন হাসান। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী ইলিশ কেনার জন্য হাটে তিন মণ ধান বিক্রি করেন তিনি। ধান বিক্রি করে পান ৩ হাজার ৫০০ টাকা। সেই অর্থ দিয়ে ১ কেজি ওজনের একটি ইলিশ কেনা হয়েছে ২ হাজার ৮০০ টাকায়। এ বছর প্রথমবারের মতো ইলিশ কেনার সুযোগ হলো তাঁর। তবে শুধু হাসান নন, ইলিশের জেলা হিসেবে পরিচিত লক্ষ্মীপুরে এখন এক কেজি ইলিশ কিনতে কৃষকদের প্রায় দুই মণ ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। জেলার বিভিন্ন হাটবাজার ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে।
কৃষকদের ভাষ্য, ধানের মাঠে তাদের ঘাম ঝরে, সেই ধান তোলা হয় হাটে। কিন্তু হাটে ধান বিক্রি করে যে অর্থ পাওয়া যায়, তা দিয়ে ইলিশ তো দূরের কথা, বাজারের নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্যই এখন কেনা সম্ভব হচ্ছে না। একদিকে কৃষকের গোলায় ওঠা ধান, অন্যদিকে বাজারের রুপালি ইলিশ—দুটোই এই অঞ্চলের মানুষের শ্রমের ফসল। অথচ দামের হিসেবে তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে আকাশ-পাতাল ব্যবধান।
রায়পুর ও সদর উপজেলার কয়েকটি হাটবাজার ঘুরে দেখা গেছে, ধানের দাম নিয়ে কৃষকদের মধ্যে তীব্র হতাশা বিরাজ করছে। জাত ও মানভেদে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায়। কৃষক মো. কামাল হোসেন বলেন, অতীতে ধান বিক্রি করে সংসারের জন্য মাছ কেনা যেত। এখন বাজারে গিয়ে শুধু টাকা হাতে ঘোরা ছাড়া আর কিছুই করার নেই। সবকিছুর দাম এত বেশি যে কিছু কেনার সাহসই পাচ্ছেন না তিনি। দুই মণ ধান বিক্রি করে এক কেজি ইলিশ কিনলে সংসারের অন্য খরচ চালানো সম্ভব হবে না বলেও মন্তব্য করেন এই কৃষক। তাই এখন ইলিশ শুধু বাজারেই দেখা হয় বলেও জানান তিনি।
লক্ষ্মীপুর ইলিশের জন্য বিখ্যাত একটি জেলা। জেলার প্রায় ৬০ হাজার জেলে মেঘনা নদীতে মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত। মেঘনা নদী ও বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন হওয়ায় জেলার বাজারগুলোতে সাধারণত ইলিশের সরবরাহ ভালো থাকে। তবে মাছের আকার ও বাজারে সরবরাহের ওপর নির্ভর করে দামের তারতম্য ঘটে। বর্তমানে বাজারে আকারভেদে এক কেজি ইলিশের দাম ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। বড় আকারের ইলিশের দাম এর চেয়েও বেশি। ফলে ১ হাজার ২০০ টাকা মণ দরে ধান বিক্রি করেও এক কেজি ইলিশ কেনার জন্য একজন কৃষককে প্রায় দুই মণ ধান বিক্রি করতে হচ্ছে।
লক্ষ্মীপুর শহরে দুই যুগ ধরে হাটে মাছ বিক্রি করেন মো. রুহুল আমিন। তিনি জানান, এবার ইলিশের বাজার বেশ চড়া। নদীতে ইলিশ কম ধরা পড়ায় অন্যান্য বছরের তুলনায় দাম বেশি। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন জানান, ইলিশের দাম মূলত মাছের আকার, সরবরাহ ও চাহিদার ওপর নির্ভর করে। বড় আকারের ইলিশের চাহিদা বেশি থাকায় দামও বেশি। নদী ও সাগরে ইলিশের প্রাপ্যতা কমে গেলে সরবরাহ কমে যায়, ফলে দাম আরও বাড়ে। তবে ইলিশের প্রজনন ও সংরক্ষণ মৌসুমে উৎপাদন ও প্রাপ্যতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে বাজারে সরবরাহ বাড়লে দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।




