বিশাল একটি বিলিয়ার্ড টেবিলের কল্পনা করুন—যেখানে কোটি কোটি বল একে অপরের সঙ্গে অবিরাম ধাক্কা খাচ্ছে, ছুটে বেড়াচ্ছে। প্রতিটি বলের গতিপথ ও বেগের নিখুঁত হিসাব বের করা মানুষের পক্ষে যেমন অসম্ভব, তেমনই পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সুপার কম্পিউটারের জন্যও এটি এক চ্যালেঞ্জ। এই অসম্ভবকে গাণিতিক সূত্রে বেঁধে ফেলেছেন ৩৭ বছর বয়সী গণিতবিদ ইউ ডেং। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক এ বছর জিতেছেন অনূর্ধ্ব-৪০ বছর বয়সী গণিতবিদদের জন্য বিশ্বের সর্বোচ্চ সম্মাননা ফিল্ডস মেডেল। অন্যদের মতো বিমূর্ত সংখ্যা ও আকার নিয়ে না মেতে, ডেংয়ের কাজ সরাসরি মহাবিশ্বের বাস্তব কার্যপ্রণালী ব্যাখ্যা করে।

পদার্থবিজ্ঞানের সমীকরণগুলোকে মোটামুটিভাবে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। একটি হলো নিউটনের গতির দ্বিতীয় সূত্র—যা দিয়ে একটি নির্দিষ্ট কণার গতিবিধি বের করা যায়। কিন্তু কোটি কোটি কণার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি অচল। অন্যদিকে রয়েছে পরিসংখ্যানভিত্তিক সমীকরণ, যা অনেক কণার সম্মিলিত আচরণ অনুমান করে। যেমন—ঢাকার একটি ব্যস্ত কাঁচাবাজারে একজন নির্দিষ্ট মানুষের দামাদামি নিউটনের সূত্রের মতো, আর ড্রোনের সাহায্যে পুরো বাজারের মানুষের কেনাকাটা দেখা পরিসংখ্যানের মতো। ১৯০০ সালে জার্মান গণিতবিদ ডেভিড হিলবার্ট তাঁর বিখ্যাত অমীমাংসিত সমস্যার তালিকায় এই প্রশ্নটিই তুলেছিলেন: কীভাবে ক্ষুদ্র নিয়মগুলো থেকে পদার্থবিজ্ঞানের বিশাল সূত্র তৈরি করা যায়? তিনি গ্যাসের ভেতরের অণুর ছোটাছুটি থেকে পুরো গ্যাসের আচরণ বোঝার কথা বলেছিলেন। গণিতবিদেরা বহু বছর ধরে এই দুই জগতের মধ্যে সেতু গড়তে চেয়েছিলেন—তাঁরা বোলজম্যান সমীকরণ ব্যবহার করতেন, কিন্তু কেবল কয়েক সেকেন্ডের জন্যই এটি মেলাতে পারতেন; দীর্ঘমেয়াদি হিসাবের ক্ষেত্রে এটি কাজ করত না।

ঠিক এখানেই বাজিমাত করেছেন ইউ ডেং। তাঁর যাত্রা শুরু হয় চীনের শেনজেনে, পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের হাতেখড়ি। এরপর এমআইটিতে পাড়ি জমান, যেখানে আংশিক অন্তরক সমীকরণ নিয়ে তীব্র আগ্রহ তৈরি হয়। কিন্তু এক পর্যায়ে তিনি মনে করেন, এই জটিল সমীকরণ সমাধানের প্রয়োজনীয় টুল এখনো আবিষ্কৃত হয়নি—হতাশ হয়ে তিনি বিষয়টি থেকে দূরে সরে যান। তবে ২০১৮ সালের দিকে তিনি আবার ফিরে আসেন। ২০২১ সালে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতবিদ জহের হানির সঙ্গে মিলে তিনি ওয়েভ কাইনেটিক ইকুয়েশনের সম্পূর্ণ সমাধান বের করেন, যা টার্বুলেন্স বা তরলের বিক্ষুব্ধ গতি নিয়ে কাজ করে। টার্বুলেন্স বলতে বোঝায় চায়ের কাপে চামচ দিয়ে নাড়ার ঘূর্ণি বা উড়োজাহাজের হঠাৎ কাঁপুনি।

টার্বুলেন্সে সাফল্যের পর ডেংয়ের আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। তিনি নজর দেন বোলজম্যান সমীকরণের দিকে। ডেং, হানি এবং জিয়াও মা নামে আরেক তরুণ গণিতবিদ মিলে এই বিশাল সমস্যাকে ভাঙার সিদ্ধান্ত নেন—ছোট ছোট ও সহজে সমাধানযোগ্য টুকরোতে বিভক্ত করেন। টানা কয়েক বছরের পরিশ্রমের পর ২০২৪ সালে তাঁরা যুগান্তকারী গবেষণা প্রকাশ করেন—দেখিয়ে দেন কীভাবে নিউটনের গতির সাধারণ নিয়ম থেকে ধাপে ধাপে বোলজম্যান সমীকরণ নিখুঁতভাবে তৈরি করা যায়। ২০২৫ সালের ফলো-আপ পেপারে তাঁরা দাবি করেন, হিলবার্টের ৬ নম্বর সমস্যার অন্তত বোলজম্যান সমীকরণের অংশটুকু তাঁরা পুরোপুরি সমাধান করে ফেলেছেন—এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকা ধাঁধার অবসান।

ফিল্ডস মেডেল পাওয়ার পর উচ্ছ্বসিত ডেং এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমি ভীষণ আনন্দিত। শুধু নিজের জন্য নয়, বরং আমি গণিতের যে শাখাটিকে প্রতিনিধিত্ব করছি, সেটি এত বড় একটি স্বীকৃতি পাচ্ছে, এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া।’ ইউ ডেং প্রমাণ করে দিয়েছেন, প্রকৃতি যতই খামখেয়ালি ও বিশৃঙ্খল হোক না কেন, তার প্রতিটি আচরণের পেছনে লুকিয়ে আছে এক নিখুঁত গাণিতিক ছন্দ—এবং সেই ছন্দ একবার ধরতে পারলে পুরো মহাবিশ্বের নিয়মকানুন হাতের মুঠোয় চলে আসবে।