বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে প্রতিদিন ভোরবেলা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা শত শত তরুণ-তরুণীর হাতে বিসিএস ও সরকারি চাকরির গাইড বই থাকলেও আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাপত্র বা উদ্ভাবনী আইডিয়ার বই দেখা যায় না। এই দৃশ্য দেশের শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত ত্রুটির ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ হেনরি কিসিঞ্জারের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ অভিধাকে মিথ্যা প্রমাণ করে মাথাপিছু আয় ও শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে এনেছে। তবে টিকে থাকার এই লড়াইয়ে শিক্ষাব্যবস্থা ও আমলাদের হস্তক্ষেপ বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে সম্প্রতি প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, বিশ্বমানের গবেষকের চেয়ে সরকারি আমলার সামাজিক মর্যাদা বেশি হওয়ায় তরুণ প্রজন্মের সৃজনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৮৩৫ সালে লর্ড মেকলের শিক্ষানীতি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জন্য অনুগত কেরানি তৈরির উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছিল। প্রায় ১৯০ বছর পরেও বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা সেই ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি বলে দাবি করা হয় প্রতিবেদনে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা গবেষণার চেয়ে প্রশাসনিক পদ ও রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তিতে বেশি সময় দিচ্ছেন, ফলে শিক্ষার্থীরা নতুন কিছু সৃষ্টির পরিবর্তে সিস্টেমের অংশ হয়ে নিরাপত্তা খুঁজছে।
বিপরীতে বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় যেমন এমআইটি বা স্ট্যানফোর্ডে গবেষণাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। ১৯৩৯ সালে স্ট্যানফোর্ডের দুই গ্র্যাজুয়েট ছাত্র উইলিয়াম হিউলেট ও ডেভিড প্যাকার্ডের গ্যারেজ থেকে সিলিকন ভ্যালির যাত্রা শুরু হয়। বাংলাদেশে একজন মেধাবী ছাত্র স্টার্টআপের পরিকল্পনা করলে পরিবার ও সমাজ তাকে আগে সরকারি চাকরি নেওয়ার পরামর্শ দেয়।
ব্রিটিশ কাউন্সিলের নেক্সট জেনারেশন বাংলাদেশ ২০২৪ গবেষণায় দেখা গেছে, ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ৫৫ শতাংশ তরুণ বিদেশে চলে যেতে চান। হিউম্যান ফ্লাইট অ্যান্ড ব্রেন ড্রেন ২০২৪ সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ১০-এর মধ্যে ৬.৭, যা বৈশ্বিক গড় ৪.৯৮-এর চেয়ে বেশি। ১৭৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৩৭তম। দেশের মেধাবীরা গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, ফান্ড ও প্রকাশনার পরিবেশ না পেয়ে দেশ ছাড়ছেন বলে উল্লেখ করা হয়।
উদ্ভাবনী সক্ষমতায় বিশ্বের ১৩০টির বেশি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ধারাবাহিকভাবে ১০৫-১১০-এর ঘরে। ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অর্গানাইজেশনের গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স অনুযায়ী পেটেন্ট নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও অবস্থা হতাশাজনক। অন্যদিকে অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের অনলাইন লেবার ইনডেক্স অনুযায়ী ফ্রিল্যান্সিং বা গিগ ইকোনমিতে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রম সরবরাহকারী দেশ, তবে অধিকাংশ কাজ লো-স্কিল পর্যায়ের।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘ট্রিপল হেলিক্স মডেল’ অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সরকারের মধ্যে সমন্বয় বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে এই চাকরিপ্রার্থীরা জব-ক্রিয়েটরে পরিণত হতে পারতেন। সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া ও এস্তোনিয়ার উদাহরণ টেনে বলা হয়, শিক্ষায় বিনিয়োগ, উদ্ভাবনকে সম্মান ও সরকারি চাকরির বাইরে বড় হওয়ার সুযোগ তৈরি করলে বাংলাদেশেরও রূপান্তর সম্ভব। প্রতিবছর তিন লাখ মেধাবীর শ্রেষ্ঠ সময় বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যয় হওয়ায় দেশ হিসেবে প্রশ্ন উঠেছে—এই মেধার অন্য কোনো গন্তব্য নেই কি?




