কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ডেটা সেন্টারের বিদ্যুতের চাহিদা অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে বিশ্বের বৃহত্তম ভূ-তাপীয় বিদ্যুৎ উৎপাদক ওরম্যাট টেকনোলজিস (Ormat Technologies) নতুন কৌশলগত মোড় নিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি পশ্চিম যুক্তরাষ্ট্রে পরিষ্কার ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্যে উন্নত ভূ-তাপীয় ব্যবস্থা—ইজিএস (EGS)—ব্যবহার করে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। এ লক্ষ্যে তারা প্রচলিত ভূ-তাপীয় প্রযুক্তির সঙ্গে তেল উত্তোলনের আধুনিক খনন ও ফ্র্যাকিং পদ্ধতির সমন্বয় ঘটাচ্ছে।

ছয় দশক ধরে ওরম্যাট প্রাকৃতিকভাবে উচ্চচাপের জল বা বাষ্পের ভাণ্ডার থাকা স্থানে—প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’ থেকে আমেরিকা পর্যন্ত—বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করে আসছে। এর ফলে তারা ভূ-তাপীয় খাতে বিশ্বের শীর্ষস্থানে পৌঁছেছে। তবে এখন প্রতিষ্ঠানটি ইজিএসের মাধ্যমে গভীর ও উচ্চ তাপমাত্রার ভূগর্ভস্থ ভাণ্ডার সহজে ব্যবহারের পথ খুলে দিচ্ছে, যা প্রায় যেকোনো স্থানে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সুযোগ তৈরি করবে। যদিও বিজ্ঞান ইতিমধ্যে প্রমাণিত, ওরম্যাট ও প্রতিদ্বন্দ্বীরা এখন দেখাতে চাইছে যে এই পদ্ধতি গ্যাস, নবায়নযোগ্য ও পারমাণবিক শক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মতো সাশ্রয়ী ও কার্যকর।

এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ওরম্যাট দুটি পৃথক পাইলট প্রকল্প শুরু করছে। একটি নেভাডার ব্লু মাউন্টেন বিদ্যুৎকেন্দ্রে ভূ-তাপীয় স্টার্টআপ সেজ জিওসিস্টেমসের (Sage Geosystems) সঙ্গে, অন্যটি ডেজার্ট পিক প্ল্যান্টে বিশ্বের বৃহত্তম তেলক্ষেত্র সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এসএলবি (SLB)-র সঙ্গে। প্রতিষ্ঠানটি গুগল ও ডেটা সেন্টার উন্নয়নকারী সুইচের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। ওরম্যাটের প্রধান নির্বাহী ডোরন ব্ল্যাচার (Doron Blachar) বলেন, “আমরা একটি বিরল অবস্থানে রয়েছি যেখানে সবকিছু ঠিক সময়ে একত্রিত হয়েছে। হাইপারস্কেলার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চাহিদা রয়েছে। এর ফলে আমাদের পণ্যের জন্য অফুরন্ত চাহিদা দেখছি।” তিনি আরও জানান, যত বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে, তত বেশি বিক্রি হবে এবং গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক অনুসন্ধান চালানো হয়েছে।

ব্ল্যাচারের মতে, ওরম্যাটের প্রচলিত ভূ-তাপীয় প্রবৃদ্ধি ও নবায়নযোগ্য সৌরশক্তির সঙ্গে বৃদ্ধি পাওয়া ব্যাটারি শক্তি সংরক্ষণ ব্যবসা—এই দুইয়ের সমন্বয় ইতিমধ্যে শক্তিশালী। ইজিএস উদ্যোগ ব্যর্থ হলেও প্রতিষ্ঠান সফল হবে বলে তিনি মনে করেন। তবুও তিনি আত্মবিশ্বাসী যে ইজিএসই ওরম্যাটের সবচেয়ে বড় সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি। “আমাদের কাছে ইজিএস উন্নয়নের সব উপাদান রয়েছে। পাইলট সফল হলে আমরা দ্রুত এগিয়ে যাব,” তিনি বলেন। তিনি আরও যোগ করেন, “এই শিল্পে ওরম্যাটের চেয়ে ভালোভাবে ইজিএসের সুযোগ নিতে পারে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। আমরা ৬০ বছর ধরে আছি। আমরা বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনায় অভিজ্ঞ।”

ওয়াল স্ট্রিটে ওরম্যাট এখন ইজিএস স্টার্টআপ ফের্ভো (Fervo)-র সঙ্গে তুলনীয়, যা মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পরিষ্কার শক্তি আইপিও নিয়ে বাজারে আসে। ফের্ভোর বাজারমূল্য দ্রুত ১,০০০ কোটি ডলারে পৌঁছালেও পরে কমে ৫০০ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। অন্যদিকে, ওরম্যাটের শেয়ারের দাম গত ১২ মাসে প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে, বাজারমূল্য প্রায় ৬৭৫ কোটি ডলার—যদিও জুনের শুরুতে সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে সামান্য কম। ব্ল্যাচার জোর দিয়ে বলেন, পাইলট প্রকল্প বাদে ওরম্যাট লাভজনক। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে প্রতিষ্ঠানটির আয় হয়েছে ৬৬ কোটি ২৭ লাখ ডলার, যা গত বছরের তুলনায় ৪৩ শতাংশ বেশি; নিট মুনাফা ৭ কোটি ১২ লাখ ডলার, যা বছরওয়ারি ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

ইসরায়েলে প্রতিষ্ঠিত ওরম্যাট ২০ বছরের বেশি সময় আগে সদর দপ্তর নেভাডার রেনোতে স্থানান্তর করে। নেভাডা ভূ-তাপীয় শক্তির জন্য একটি উষ্ণ কেন্দ্র এবং দুটি পাইলট প্রকল্পই সেখানে অবস্থিত। সেজের সঙ্গে পাইলটটি ব্লু মাউন্টেনে, আর এসএলবির সঙ্গে ডেজার্ট পিকে। এছাড়া নিউ মেক্সিকো, ওরেগন ও আইডাহোতে নতুন জমি অধিগ্রহণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। টেক্সাসেও ব্ল্যাচার আশাবাদী। সেজের প্রথম মাইলফলক পাইলট—ওরম্যাট প্রকল্পের পূর্বসূরি—আগস্টে সান আন্তোনিওর কাছে চালু হয়েছে। ২০১৩ সালে অর্থনৈতিক প্রধান হিসেবে যোগ দিয়ে ২০২০ সালে প্রধান নির্বাহী হওয়া ব্ল্যাচার এখনো তেল আবিবে বসবাস করেন এবং বিশ্বজুড়ে প্রকল্প তদারকিতে ভ্রমণ করেন—রেনো থেকে ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক ও নিউজিল্যান্ড পর্যন্ত। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে ইন্দোনেশিয়াই ওরম্যাটের বৃহত্তম লক্ষ্যবস্তু। “ইন্দোনেশিয়ায় আমরা উন্নয়ন করছি, কিন্তু প্রক্রিয়াগুলো দীর্ঘ এবং আমরা অনেক বেশি সতর্ক। যুক্তরাষ্ট্রে আমরা এই পরিবেশে বেশি ঝুঁকি নিতে ইচ্ছুক,” তিনি বলেন।

বর্তমানে ওরম্যাটের বিশ্বজুড়ে পরিচালিত বিদ্যুৎ পোর্টফোলিও ১.৮৫ গিগাওয়াট—যা প্রায় ১৪ লাখ মার্কিন পরিবারের বা দুটি বড় ডেটা সেন্টার কমপ্লেক্সের জন্য যথেষ্ট। ২০২৮ সালের লক্ষ্যমাত্রা হলো প্রচলিত ভূ-তাপীয় ও ব্যাটারি সংরক্ষণের মাধ্যমে ২.৮ গিগাওয়াট পর্যন্ত পৌঁছানো—ইজিএস বাদে। কিন্তু ইজিএস ভূগর্ভে যা গড়ে তুলতে পারে, তার তুলনায় এটি সামান্য। ব্ল্যাচার জানান, ওরম্যাট প্রতি বছর প্রায় ১০০ মেগাওয়াট ভূ-তাপীয় শক্তি উন্নয়ন করছিল। হাইপারস্কেলারের সঙ্গে প্রতিটি ইজিএস প্রকল্প সহজেই ৫০০ মেগাওয়াট হতে পারে।

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কম—কারণ রিপাবলিকানরা বায়ু ও সৌরশক্তিকে আক্রমণ করলেও এবং ডেমোক্র্যাটরা জীবাশ্ম জ্বালানির নিঃসরণকে লক্ষ্য করলেও, ভূ-তাপীয় শক্তি উভয় দলের কাছেই প্রিয়। ডেমোক্র্যাটরা পরিষ্কার শক্তি চায়, আর রিপাবলিকানরা পছন্দ করে যে প্রচলিত তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলো ভূ-তাপীয় ব্যবসায় প্রবেশ করে লাভবান হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, এসএলবি ভূ-তাপীয় খাতে বিস্তার ঘটাচ্ছে এবং ভূগর্ভস্থ বিশ্লেষণ ও কূপ খননের দক্ষতা দিচ্ছে। ওরম্যাটের পাইলট প্রকল্পগুলো পরবর্তী সময়ে খনন শুরু হবে এবং ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ চালু হতে পারে বলে ব্ল্যাচার জানান। “একবার শেষ হলে, আমরা ইজিএস প্রকল্প উন্নয়ন শুরু করব।”

২০ বছর আগে ওরম্যাট ইজিএস নিয়ে পরীক্ষা করেছিল, কিন্তু তখন তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও কঠিন ছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের তেল উৎপাদকরা এখন ৫ মাইল দীর্ঘ অনুভূমিক কূপ ভূগর্ভে খনন করতে সক্ষম হওয়ায় খনন প্রযুক্তি দ্রুত উন্নত হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে ওরম্যাট ‘ওরমেগা ১০০’ (Ormega100) বিদ্যুৎকেন্দ্র ইউনিট চালু করে—একটি মানসম্মত ও সরলীকৃত নকশা, যেখানে চলমান অংশ কম এবং ইজিএসের সঙ্গে সাশ্রয়ীভাবে বড় আকারে বিস্তার লাভের উদ্দেশ্যে তৈরি।

“ইজিএস আজ অনেক বেশি বাস্তবসম্মত ফলাফলে পরিণত হচ্ছে,” ব্ল্যাচার বলেন। “যখন ওরম্যাটের অভিজ্ঞতা, বিদ্যুৎকেন্দ্রের নকশায় ব্যবসায়িক উন্নয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের ভূমি ও অবস্থানের পরিমাণ একত্রিত হয়, তখন আমরা এই নতুন প্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে অনেক দ্রুত বৃদ্ধি পাব।” এই প্রতিবেদনটি প্রথমে ফরচুন ডট কমে (Fortune.com) প্রকাশিত হয়েছিল।