শনিবার মধ্যরাত থেকে কার্যকর হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কের প্রেক্ষাপটে কানাডার সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে পড়েছে। শুক্রবার রাতের সময়সীমার ঠিক আগে আলোচনার স্থগিতকরণের ঘোষণা দেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, মার্কিন পণ্যের ওপর ‘ডলার ফর ডলার’ নীতিতে পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হবে।
কার্নির ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শর্তে শেষ মুহূর্তে করা পরিবর্তনগুলো শুধু অন্যায্যই নয়, অর্থনৈতিকভাবেও অযৌক্তিক। এ ধরনের আচরণ যেকোনো সম্ভাব্য চুক্তির নির্ভরযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে বলে তিনি মন্তব্য করেন। যদিও আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছিল, তবুও তা কানাডার জনগণের প্রত্যাশা পূরণে পর্যাপ্ত ছিল না বলে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন। এর ফলে তিনি আলোচনা স্থগিত করে আলোচক দলকে অটোয়ায় ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন।
গত জুলাই মাস থেকে দুই দেশের বাণিজ্য প্রতিনিধিরা তীব্র আলোচনা চালিয়ে আসছিলেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগস্টের ১৯ তারিখের মধ্যে কানাডার প্রায় দুই হাজার কোটি ডলার (২৮ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার) মূল্যের আমদানির ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন। চলতি সপ্তাহের শুরুতে সেই শুল্ক সাময়িকভাবে স্থগিত করে ট্রাম্প বলেছিলেন, উভয় দেশের জন্য ‘খুব ভালো’ একটি চুক্তি স্বাক্ষরের পথে রয়েছে দুই পক্ষ। কিন্তু সময়সীমার কয়েক মিনিট আগে কার্নি জানিয়ে দেন, আলোচনায় অগ্রগতি থাকলেও তা যথেষ্ট নয়।
আলোচনা ভেঙে পড়ার ফলে দুই পক্ষের মধ্যে সুরের ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। সপ্তাহের শুরুর দিকে উভয় দেশের কর্মকর্তারা একটি লাভজনক চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী ছিলেন। আলোচনা চলাকালীন প্রস্তাবিত ছিল, কানাডার ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর শুল্ক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ এবং গাড়ির ওপর ২৫ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ করা হতে পারে। এর বিনিময়ে কার্নি কানাডার প্রদেশগুলোকে দোকানের তাকে যুক্তরাষ্ট্রের মদ পুনরায় রাখার অনুরোধ জানিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার এক বিবৃতিতে বলেন, কানাডা আগের সপ্তাহে সম্মত শর্তে চুক্তি চূড়ান্ত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র কানাডাকে প্রধান রপ্তানিকারক হিসেবে সেরা সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু কানাডার নতুন দাবি ও আগের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসার কারণে কয়েক দিনের মধ্যে তৈরি হওয়া ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন ৫০ শতাংশ শুল্ক ১৯৩০ সালের মহামন্দা-যুগের ‘শুল্ক আইন’ ব্যবহার করে আরোপ করা হয়েছে। ওয়াইন, দুগ্ধজাত পণ্য, সিমেন্ট, পোশাক ও হকি সরঞ্জামের মতো পণ্যের ওপর এই শুল্ক কার্যকর হবে। এগুলো পূর্বে ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, গাড়ি ও কাঠের ওপর আরোপিত শুল্কের অতিরিক্ত।
ট্রাম্প গত বছরের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় ফিরে এসে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক শুল্ক কর্মসূচি চালু করলে দুই দেশের মধ্যে কয়েক দশকের মুক্ত বাণিজ্য সম্পর্ক বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। কানাডা এক বছরেরও বেশি সময় ধরে এই আলোচনায় নিযুক্ত রয়েছে, যাতে মার্কিন শুল্ক কমানো বা প্রত্যাহার করা যায়। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র কানাডার কাছে বেশ কিছু ছাড় চেয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে মার্কিন গাড়ির ওপর পাল্টা শুল্ক প্রত্যাহার, দুগ্ধ কোটা সামঞ্জস্য করে মার্কিন পনির উৎপাদনকারীদের বেশি সুযোগ দেওয়া এবং প্রদেশভিত্তিক মার্কিন মদ বিক্রির নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া।
কানাডার সবচেয়ে বড় প্রদেশ অন্টারিওর প্রধান ডগ ফোর্ড কার্নির সিদ্ধান্তকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে বলেন, ‘শুল্কের বিপরীতে শুল্ক, ডলার ফর ডলার’—এই শক্তিশালী প্রতিক্রিয়ার পক্ষে তিনি রয়েছেন। উভয় দেশের ব্যবসায়ী ও অংশীদাররা একটি চুক্তির পক্ষে চাপ দিয়েছিলেন। মার্কিন চেম্বার অব কমার্স সতর্ক করে বলেছিল, উচ্চ শুল্ক দুই অর্থনীতিরই ক্ষতি করবে, মার্কিন পরিবারের খরচ বাড়াবে, সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘ্নিত করবে এবং USMCA চুক্তির অধীনে ১ কোটি ৩০ লাখ আমেরিকানের চাকরির ঝুঁকি তৈরি করবে।
কানাডিয়ান ফার্ম অ্যাবাকাস ডেটার সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৩৬ শতাংশ কানাডিয়ান মার্কিন শুল্কের পাল্টা ব্যবস্থা সমর্থন করেন, আর ৩০ শতাংশ চান কার্নি সরকার আলোচনা চালিয়ে যাক। তবে গ্রিয়ার সতর্ক করে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা শুল্ক ‘সহ্য করবে না’ এবং প্রয়োজনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




