বাংলাদেশের সিভিল সমাজ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক বিতর্ক বিদ্যমান। 'সিভিল সোসাইটি'-র বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে 'সুশীল সমাজ' শব্দটি ব্যবহৃত হলেও অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি প্রকৃত অর্থ বহন করে না। কারণ বাস্তবে এই সমাজ সবসময় ভদ্র বা সৎ আচরণ প্রদর্শন করে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে অসুশীল ও দুষ্ট চরিত্র ধারণ করে। নিবন্ধটি বাংলাদেশের সিভিল সমাজের প্রকৃতি, তত্ত্ব, সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছে।

সিভিল সমাজের ধারণার উৎপত্তি পশ্চিমা দার্শনিকদের চিন্তা থেকে। হেগেল প্রথম রাষ্ট্রের বাইরে ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষার্থে গড়ে ওঠা সংগঠনকে সিভিল সোসাইটি হিসেবে চিহ্নিত করেন। তার মতে, রাষ্ট্রের ক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে ব্যক্তির অধিকার সংকুচিত হচ্ছে, তাই স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। তোকভিল মার্কিন গণতন্ত্রে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ভূমিকাকে গুরুত্ব দেন যা রাষ্ট্রের স্বেচ্ছাচার রোধ করে। গ্রামসি আধিপত্য ও বলপ্রয়োগের মধ্যে পার্থক্য করে সিভিল সমাজকে ঐকমত্য ও সংঘাতের মধ্যে দোলায়িত একটি ক্ষেত্র হিসেবে বর্ণনা করেন। বিংশ শতাব্দীর শেষে হাবেরমাস ও ফুকোর মধ্যে তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব প্রধান। হাবেরমাস গণক্ষেত্রে যুক্তিবাদী আলোচনার মাধ্যমে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার পক্ষে, অন্যদিকে ফুকো সংঘাতকে গণতন্ত্রের মূল চালিকাশক্তি বলে মনে করেন। তিনি বলেন সংঘাত দমন করা স্বাধীনতা দমনের শামিল। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই তত্ত্বগুলোর প্রয়োগ সীমিত, কারণ এখানকার সিভিল সমাজ রাষ্ট্র ও দানশীলতার সংমিশ্রণে গঠিত।

বাংলাদেশে সিভিল সমাজের ইতিহাস ব্রিটিশ শাসনামল থেকে শুরু। স্বাধীনতার পর এর ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৭০ হাজার সিভিল সমাজ সংগঠন রয়েছে, যার মধ্যে সিংহভাগ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সমবায় সমিতি। এনজিও সংখ্যাও অনেক, তবে তাদের অধিকাংশই ঋণ বিতরণ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত। রাজনৈতিক ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করে মাত্র ১৭ শতাংশ সংগঠন। অন্যদিকে মাস্তান ও দলীয় ছাত্র রাজনীতির কারণে অসুশীল সমাজের প্রসার ঘটেছে, যা প্রকৃত সিভিল সমাজের পথে বড় বাধা। এই অসুশীল সংগঠনগুলোর সদস্যসংখ্যা সিভিল সমাজের সংগঠনের চেয়ে কম নয় বলে ধারণা করা হয়। ধর্মীয় সংগঠনগুলোর অধিকাংশই অসহিষ্ণু ও ভিন্নমত সহনশীল নয়, যা 'সিভিলিটি'-র সংজ্ঞার সাথে সাংঘর্ষিক।

বাংলাদেশের সিভিল সমাজের আরেকটি বড় সমস্যা হলো এর দলীয় রাজনীতির প্রতি ঝোঁক ও জবাবদিহির অভাব। অনেক এনজিও পরিবারতান্ত্রিক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। বিদেশি অর্থের ওপর নির্ভরশীলতা তাদের সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। সিভিল সমাজের নেতৃত্বাধীন সংস্কার কর্মসূচি, যেমন বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ, মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠা ও তথ্য অধিকার আইন, প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ পুলিশকে স্বাধীন করে মানবাধিকার পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে। মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার আট বছর পরও কোনো দৃষ্টান্তমূলক সাফল্য নেই। তথ্য অধিকার আইনও বাংলাদেশের দুর্বল বিচার ও প্রশাসন ব্যবস্থায় কার্যকর হয়নি। ফলে সিভিল সমাজের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। অনেক বিশ্লেষক বাংলাদেশের সিভিল সমাজকে 'ফরমায়েশি সিভিল সমাজ' বলে অভিহিত করেছেন, যা তৃণমূলের চাহিদা থেকে নয় বরং দাতাদের অর্থে গড়ে উঠেছে।

তবুও সিভিল সমাজের ধারণা সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করা যায় না। ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস, স্যার ফজলে হাসান আবেদের মতো নেতা বাংলাদেশের সিভিল সমাজকে আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত করেছেন। তবে শুধু সিভিল সমাজের ওপর নির্ভর করে রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্ভব নয়; প্রয়োজন রাজনৈতিক শক্তির সাথে সমন্বয়। অন্যথায় সিভিল সমাজ সুশীল থেকে দুঃশীলে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। মাইকেল এডওয়ার্ডস যেমন বলেছেন, সিভিল সমাজ মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব জাগ্রত করতে পারে যদি তা ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতার পথে পরিচালিত হয়। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই লক্ষ্য অর্জন এখনও কঠিন। নিবন্ধের উপসংহারে বলা হয়েছে, সিভিল সমাজ ও রাজনৈতিক শক্তির যৌথ প্রচেষ্টাই সমাজ পরিবর্তনের সফল পথ হতে পারে।