মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী শহীদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনাদের একটি নির্ভুল তালিকা প্রস্তুত করতে উদ্যোগী হয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে বুধবার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়, যেখানে তালিকা প্রণয়নের কৌশল ও করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান।
আলোচনায় বক্তারা অভিমত প্রকাশ করেন যে, তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে আবেগ বা অনুমানের কোনো স্থান নেই; বরং প্রামাণ্য দলিল, সরকারি ও সামরিক নথি, মুক্তিযুদ্ধকালীন রেকর্ড, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য এবং স্থানীয় পর্যায়ের তথ্যের সমন্বয়ে বহুমাত্রিক যাচাইয়ের মাধ্যমে তালিকা প্রণয়ন করতে হবে। বিচ্ছিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে তালিকা করা অনুচিত বলেও তাঁরা মন্তব্য করেন। মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সাক্ষ্য দ্রুত সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন আলোচকরা, কারণ দিন যত যাচ্ছে প্রত্যক্ষদর্শীদের সংখ্যা কমছে।
গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, পরিবার, প্রশাসন, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয় সভায়। এতে অংশ নেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুকোমল বড়ুয়া, দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক আব্দুল হাই শিকদার, বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুল আলম বীর প্রতীক, বাংলাভিশনের প্রধান সম্পাদক আবদুল হাই সিদ্দিক, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জামিল ডি আহসান বীর প্রতীক, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আজিজুর রহমান বীর উত্তম, সিপিবির সাবেক সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান খান, বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক আহমেদ খান, জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাত, বীর মুক্তিযোদ্ধা নইম জাহাঙ্গীরসহ অন্যান্য বিশিষ্টজনরা।
সভাপতির বক্তব্যে মন্ত্রী আহমেদ আযম খান বলেন, মুক্তিযুদ্ধ জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন এবং এ ইতিহাসকে নির্ভুলভাবে সংরক্ষণ করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। দীর্ঘদিন ধরে তালিকায় অনিয়ম ও অমুক্তিযোদ্ধা অন্তর্ভুক্তির অভিযোগকে তিনি দুর্ভাগ্যজনক বলে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, এ অবস্থার অবসান ঘটিয়ে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়নের পাশাপাশি শহীদ ও বীরাঙ্গনাদের নির্ভুল তালিকা প্রস্তুত করতে কাজ করছে মন্ত্রণালয়। স্বাধীনতার পরপরই প্রশাসনিক কাঠামো স্বাভাবিক না থাকায় তথ্য-উপাত্ত ছাড়াই অনুমানের ভিত্তিতে সংখ্যা ঘোষণা করা হয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মন্ত্রী আরও বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে এই তালিকা প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। লক্ষাধিক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা তৈরি করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে কলঙ্কিত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। সঠিক তালিকা উপস্থাপন করা গেলে ইতিহাসবিদরা প্রামাণ্য তথ্য পাবেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নির্ভুল ইতিহাস জানতে পারবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন আহমেদ আযম খান। এ কাজে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, ইতিহাসবিদ, গবেষক ও শিক্ষাবিদদের সম্পৃক্ত করা হবে বলেও জানান তিনি।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন তাঁর বক্তব্যে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিতে কোনো অস্পষ্টতা থাকা উচিত নয়। প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করতে তালিকা প্রণয়ন ও যাচাই-বাছাইয়ের কাজ সর্বোচ্চ সতর্কতা, নিরপেক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পন্ন করতে হবে বলে জোর দেন তিনি। রণাঙ্গনে শহীদদের পাশাপাশি হানাদার বাহিনীর হাতে নিহত সাধারণ মানুষ, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের তথ্যও সংগ্রহ, যাচাই ও সংরক্ষণ করা জরুরি বলে মত প্রকাশ করেন বক্তারা। মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ সশস্ত্র অংশগ্রহণকারীদের স্বতন্ত্র রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি অক্ষুণ্ন রেখে বৃহত্তর জাতীয় অংশগ্রহণের ইতিহাস নথিভুক্ত করার বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পায়। প্রতিটি নামের অন্তর্ভুক্তির পেছনে দলিল, সাক্ষ্য ও যাচাইয়ের ভিত্তি সংরক্ষণ করা হলে তা ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য উপযোগী হবে বলেও মত দেন সভায় উপস্থিত বিশিষ্টজনরা।




