প্রধান নির্বাহী হিসেবে টিম কুকের সর্বশেষ আয় সংক্রান্ত আলোচনায় অ্যাপল এক সতর্কবার্তা দিয়েছে যে, সরবরাহ শৃঙ্খলে তীব্র সংকট আগামী মাসগুলোতে আইফোন ও ম্যাক কম্পিউটারের বিক্রি ব্যহত করতে পারে। ১৫ বছরের নেতৃত্বের ইতি টেনে সেপ্টেম্বরে জন টারনাসের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের আগে কুক মন্তব্য করেন, অ্যাপলের সামনে থাকা সম্ভাবনা নিয়ে তিনি আগের চেয়ে বেশি আশাবাদী। “আমি ভীষণ উৎফুল্ল,” বলেন কুক।
তবে বর্তমান ব্যবসায়িক পরিস্থিতি নিয়ে কুক ও অন্যান্য নির্বাহীদের দেওয়া চিত্র ছিল ভিন্ন। কুক স্পষ্ট করে বলেন, “আমরা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু সীমাবদ্ধতা দেখতে পাচ্ছি, সরবরাহ শৃঙ্খলে নমনীয়তা খুবই সীমিত।” তিনি আরও স্বীকার করেন, “এমন এক প্রান্তিক আসছে যেখানে আমাদের সরবরাহের দিকে হিমসিম খেতে হবে।” উন্নত প্রসেসরের এই সংকট ফোন ও কম্পিউটারের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহে জটিলতা তৈরি করছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে রাজস্বে। প্রতিষ্ঠানটির অর্ধেক ব্যবসার জোগানদাতা আইনোনের বিক্রয় চলতি প্রান্তিকে “মধ্য-কিশোর” শতাংশ হারে বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা সবেমাত্র সমাপ্ত প্রান্তিকের ২২% প্রবৃদ্ধি থেকে বড় ধরণের মন্থরতার ইঙ্গিত দেয়।
চলতি প্রান্তিকে সার্বিক রাজস্ব বছরওয়ারি ৯% থেকে ১০% বৃদ্ধি পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা বিশ্লেষকদের প্রত্যাित ১২% হারের চেয়ে কম। সাম্প্রতিক প্রান্তিকে শুল্ক ফেরত বাদে মোট মুনাফার হার রাজস্বের ৪৮% থাকলেও, এই প্রান্তিকে তা চাপে পড়বে বলে জানিয়েছে অ্যাপল। বৃহস্পতিবার আয়ের ফলাফল প্রকাশের পর লেনদের পরের হাতেবাজারে অ্যাপলের শেয়ারমূল্য এক পর্যায়ে ৮% পর্যন্ত হ্রম পায়, পরে কিছুটা পুনরুদ্ধার করে। শেয়ারটি তার সমাপ্তী মূল্য $৩৩৩.৮৫ থেকে প্রায় ৬% নিচে লেনেন হয়। বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান এই কোম্পানির (বাজার মূলধন $৪.৯ ট্রিলিয়ান!) শেয়ার ২০২৬ সালে এ পর্যন্ত ২৩% বেড়েছে, যা বৃহৎ প্রযুক্তি শেয়ারগুলোর মধ্যে সেরা প্রদর্শনকারীদের একটি।
অ্যাপল যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দৌঁড়ে পিছিয়ে এবং নিজস্ব এআই মডেল তৈরিতে সংগ্রাম করে চলেছে, বিনিয়োগকারীরা উপলদ্ধি করতে পেরেছেন যে কোম্পানিটি মেটা, গুগল, মাইক্রোসফট ও অ্যামাজনের মতো এআই অবকাঠামো প্রতিযোগিতায় জড়ায়নি। তবে এর ব্যবসা ঠিকই এআই প্রতিযোগিতার প্রভাব, বিশেষ করে মেমোরি চিপের ক্ষেত্রের, অনুভব করছে। এআই-কে শক্তিশালী করতে নির্মিত ডেটা সেন্টারগুলোতে মেমোরি চিপের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহে ঘাটতি ও মূল্যের ঊর্ধ্বগতি তৈরি হয়েছে। জুনে অ্যাপল বর্ধিত মেমোরি চিপের দাম সমন্বয়ে করতে তার ম্যাক ও আইপ্যাডের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়।
কুক এই পরিস্থিতিকে “মেমোরি মূল্যের ক্ষেত্রে শতাব্দীর ভয়াবহ বন্যা” হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ডিআরএএম মেমোরি চিপের বাজার মূলত মাইক্রোন, এসকে হাইনিক্স ও স্যামসাং— এই তিন কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে। কুক কিছুটা রহস্যজনক ভঙ্গিতে যোগ করেন, “যদি আরও সরবরাহকারী থাকত, সেটা ভালো হতো। সেটা সরবরাহের ক্ষেত্রে, এবং সম্ভবত দামের ক্ষেত্রেও আমাদের সাহায্য করতো।” তিনি ইঙ্গিত দেন যে অ্যাপল “সব ধরনের বিকল্প বিবেচনা করছে।”
নতুন সিরি এআই সহ অ্যাপলের এআই সেবা সম্পর্কে এক প্রশ্নের উত্তরে কুক বলেছেন, ব্যবহারকারীর ডিভাইসে সরাসরি এআই চালানোর একটি সুযোগ কোম্পানি দেখছে। অ্যাপল বিশ্বাস করে, এই পদ্ধতি গোপনীয়তাসচেতন ব্যবহারকারীদের আকৃষ্ট করতে পারে। তার ভাষ্য, “কিছু অনুরোধ ডিভাইসে চলার ক্ষমতা খুবই কৌশলী, এক ধরণের প্রতিযোগিতামূলক অস্ত্র বলা যেতে পারে।” তবে তিনি আরও উল্লেখ করেন যে এআই সুবিধা অ্যাপলের আইক্লাউড ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়াতে পারে— যা কোম্পানির দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যবসায়িক ইউনিট সার্ভিসেস-এর জন্য সম্ভাব্য সুযোগ।
৩০ জুন সমাপ্ত তিন মাসে অ্যাপলের মোট আয় দাঁড়িয়েছে $১০৯.৪ বিলিয়ন ডলার, যা বছরওয়ার ১৬% বেশি এবং বিশ্লেষকদের প্রত্যাশার প্রায় অনুরূপ। কোম্পানির নীট মুনাফা হয়েছে $২৯.৮ বিলিয়ন, বা শেয়ার প্রতি $২.০২, যেখানে বিশ্লেষকরা $১.৮৯ আয়ের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। অ্যাপল জানিয়েছে, শেয়ার প্রতি মুনাফার প্রায় ১১ সেন্ট এসেছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শুল্ক থেকে ফেরতের কারণে।
নতুন প্রধান নির্বাহী হিসেবে জন টারনস এই আয় আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু পূর্বলিখিত বক্তব্য প্রদান করেন এবং প্রশ্নোত্তর পর্বের জন্য তাকে সরাসরি উপলদ্ধ করা হয়নি। এক বিশ্লেষক তার কাছে প্রতিযোগিতার চিত্র, বিশেষ করে যখন স্পেসএক্স ও ওপেনএআই এর মত প্রতিদ্বন্দীরা এআই-চালিত হার্ডওয়্যার ডিভাইস প্রস্তুত করতে পারে, তা জানতে চাইলে টারনাস বলেন, “আমি কেবল কুক যা বলেছেন তা পুনরুল্লেখ করবো। এই খাতে যা কিছুই ঘটছে, তাতে আমাদের জন্যয সুযোগ রয়েছে। আমরা শুধু নিজেদের পরিকল্পনায় মনোযোগী এবং এ নিয়ে সত্যই উৎফুল্ল।”



