ঐতিহ্যবাহী মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের নতুন মৌসুমের দলবদল এবার এক অনন্য উৎসবে পরিণত হলো। গাঁদা ফুলে সাজানো পাঁচটি ঘোড়ার গাড়ি, সাদা-কালো পতাকার সমারোহ, বাজির শব্দ আর ব্যান্ডপার্টির তালে তালে সমর্থকদের বাঁধভাঙা আনন্দে মতিঝিল ক্লাবপাড়ায় ফিরে এলো পুরোনো ফুটবল উন্মাদনা। ক্লাব প্রাঙ্গণ থেকে বর্ণাঢ্য র্যালি বের করে বাফুফে ভবনে গিয়ে খেলোয়াড় তালিকা জমা দেয় সাদা-কালো শিবির।

এই দলবদলের মূল আকর্ষণ ছিল গত মৌসুমের ট্রেবলজয়ী বসুন্ধরা কিংস থেকে ৯ জন খেলোয়াড়কে দলে ভেড়ানো। এর আগেই আটজন খেলোয়াড় দলে যোগ দিয়েছিলেন। সর্বশেষ বুধবার দুপুরে কিংস ছেড়ে মোহামেডানে যোগ দেন জাতীয় দলের গোলকিপার আনিসুর রহমান জিকো। ২০১৮ সালে বসুন্ধরা কিংসের শীর্ষ লিগে যাত্রা শুরুর সময় থেকে দলটির সঙ্গে ছিলেন এই গোলকিপার। জিকোকে পেয়ে মোহামেডানে এখন জাতীয় দলের দুজন গোলকিপার রয়েছেন—সুজন হোসেন ও জিকো। এছাড়া দলে ফিরে এসেছেন সুলেমান দিয়াবাতের মতো পরীক্ষিত সৈনিকও।

বুধবার দুপুর থেকেই মতিঝিলের মোহামেডান ক্লাব প্রাঙ্গণ ছিল উৎসবমুখর। ক্লাবের প্রধান ফটক থেকে পুরো আঙিনা নতুন ব্যানারে সাজানো হয়েছিল। ক্লাব কর্মকর্তা, নতুন মৌসুমের খেলোয়াড় এবং শত শত সমর্থকের গায়ে ছিল সাদা-কালো জার্সি। পরিবেশজুড়ে ছিল পুরোনো ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণের আনন্দ।

নতুন পরিচালনা বোর্ড গতবারের ১৭ জন খেলোয়াড়কে রেখে বসুন্ধরা কিংস থেকে দলে ভেড়ায় ডিফেন্ডার সাদ উদ্দিন, রিমন হোসেন, টনি আগাবাজি; মাঝমাঠের সোহেল রানা, মুজিবুর রহমান জনি, শাহরিয়ার ইমন এবং ফরোয়ার্ড ফয়সাল আহমেদ ফাহিম ও ইমানুয়েল সানডেকে। আর শেষ চমক হিসেবে নেওয়া হলো জিকোকে। মোহামেডানকে ১৬ মাস আগে লিগে চ্যাম্পিয়ন করা সাবেক অধিনায়ক সুলেমান দিয়াবাতে আবাহনীতে এক মৌসুম কাটিয়ে আবারও পুরোনো ক্লাবে ফিরে এসেছেন।

ফিফার নিষেধাজ্ঞার কারণে দলবদল নিয়ে বসুন্ধরা কিংস ও আবাহনী যখন কোণঠাসা, তখন মোহামেডানে পুরো ভিন্ন ছবি দেখা যাচ্ছে। আজ পড়ন্ত বিকেলে ঘোড়ার গাড়িতে করে খেলোয়াড়দের নিয়ে মতিঝিল কাঁপিয়ে বাফুফে ভবনে গেলে সেখানেও সাদা-কালো সমর্থকদের ভিড় ছিল। সংবাদমাধ্যমের উপস্থিতিতেও যেন মোহামেডানের এই উচ্ছ্বাস মৃতপ্রায় ঘরোয়া ফুটবলে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছে।

ক্লাব সংলগ্ন অডিটোরিয়ামে খেলোয়াড়দের পরিচিতি পর্বে বক্তব্য দেন ক্লাবের সভাপতি সংসদ সদস্য বরকত উল্লাহ বুলু, ডিরেক্টর ইনচার্জ লোকমান হোসেন ভূঁইয়া, ফুটবল কমিটির চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল, ক্রিকেট কমিটির চেয়ারম্যান মাসুদুজ্জামান। কর্তারা জানান, ষাট, সত্তর ও আশির দশকের সেই ঐতিহাসিক ফুটবল উন্মাদনা মাঠে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ করছেন তারা। নতুন মৌসুমে ডেনমার্ক বা উজবেকিস্তান থেকে বিদেশি কোচ আনার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে কুমিল্লা ছেড়ে ঢাকা স্টেডিয়ামকে হোম ভেন্যু করতে চায় ক্লাব কর্তৃপক্ষ।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কানন, সাব্বির, জোসি, বাবলুসহ একঝাঁক সাবেক তারকা। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন প্রতাপ শংকর হাজরা ও গোলাম সারোয়ার টিপু। অনেকের গায়েই ছিল সাদা-কালো জার্সি।

দলবদল শেষে সংবাদমাধ্যমের কাছে নতুন চ্যালেঞ্জের কথা জানান গোলকিপার জিকো। বসুন্ধরা কিংসের হয়ে ৮ মৌসুমে ৬টি লিগসহ সম্ভাব্য সব ট্রফি জয়ের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নতুন চ্যালেঞ্জ নেওয়ার উপযুক্ত সময় বলেই মোহামেডানে যোগ দিয়েছেন। তাঁর মতে, দলের সবাই একতাবদ্ধ হয়ে ভালো বন্ডিং তৈরি করতে পারলে এবং চ্যাম্পিয়ন মানসিকতা নিয়ে খেলতে পারলে মোহামেডানকে ট্রেবল জেতানো সম্ভব।

ক্লাবে সুজন হোসেনের মতো জাতীয় দলের আরেক শীর্ষ গোলকিপারের উপস্থিতি প্রসঙ্গে জিকো বলেন, সুস্থ প্রতিযোগিতা দলের জন্যই ইতিবাচক। অনুশীলনে যিনি সেরাটা দেবেন, তিনিই একাদশে খেলার সুযোগ পাবেন।

মোহামেডানের স্কোয়াড: গোলরক্ষক — সুজন হোসেন, আহসান হাবিব বিপু, ইসমাইল হোসেন মাহিন, আনিসুর রহমান জিকো। ডিফেন্ডার — রহমত মিয়া, সাদ উদ্দিন, শাকিল আহাদ তপু, জাহিদ হাসান শান্ত, ইসমাইল হোসেন, আজিজুল হক অনন্ত, ইমানুয়েল টনি, রিমন হোসেন, শাহিন আহমেদ, হাফিজুর রহমান বাবু। মিডফিল্ডার — সোহেল রানা, মিনহাজ আবেদীন বাল্লু, মেহেদী হাসান রয়েল, রহিম উদ্দিন, জুয়েল মিয়া, রাজু আহমেদ, মুজিবুর রহমান জনি, শফিউল হোসেন, আমির হাকিম বাপ্পি, কামাল মৃধা, মেহেদী হাসান, আরিফ হোসেন, মোজাফফর মোজাফফরভ, শাহরিয়ার ইমন। ফরোয়ার্ড — সুলেমান দিয়াবাতে, সৌরভ দেওয়ান, ইমানুয়েল সানডে, ফয়সাল আহমেদ ফাহিম, জয় আহমেদ।