হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত দিন দিন তীব্র আকার ধারণ করছে। গত মঙ্গলবার টানা পাঁচ ঘণ্টা ধরে ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। এর জবাবে জর্ডান ও বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থানগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে তেহরান। সংঘাতের এই নতুন মাত্রায় গত ১৭ জুন দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি বাস্তবায়ন ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

বর্তমান পরিস্থিতিতে পুরো যুদ্ধই হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। ইরান চায় এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে, যা তাদের যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশলের অংশ। সমঝোতা স্মারকের পঞ্চম দফায়ও এই বিষয়টি উল্লেখ ছিল। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, হরমুজের রক্ষক হবে যুক্তরাষ্ট্র এবং এই জলপথ ব্যবহারের জন্য জাহাজ চলাচলের ফি আদায় করবে তারা।

যুক্তরাষ্ট্র ৭ জুলাই ইরানে নতুন করে হামলা শুরু করে, যা দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ জুলাই মার্কিন কংগ্রেসকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানে হামলা শুরুর কথা জানিয়েছেন ট্রাম্প। মার্কিন সংবিধানের বিধান অনুযায়ী, কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়াই ট্রাম্প প্রশাসন ৬০ দিন পর্যন্ত এই হামলা চালিয়ে যেতে পারবে।

সংঘাতের এই ধারায় বিশ্ব জ্বালানি বাজার আবার অস্থির হয়ে উঠেছে। সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল কিছুটা বেড়েছিল, কিন্তু নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হওয়ায় তা আবার তলানিতে ঠেকেছে। ফলস্বরূপ, গত চার সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে অপরিশোধিত তেলের দাম। গতকাল প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ৮৬ ডলারের বেশি ছাড়িয়ে গেছে।

ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজে জাহাজ চলাচলের জন্য নিজেদের উপকূলবর্তী নির্দিষ্ট রুট নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে, যুক্তরাষ্ট্র চায় প্রণালির দক্ষিণে ওমান উপকূল দিয়ে জাহাজ চলাচল করাতে। ৭ জুলাই হামলার আগে ওমান উপকূল দিয়ে চলাচল করা তিনটি জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছিল। তারপর থেকে ৯ ও ১০ জুলাই বাদে প্রতিদিনই ইরানে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। পাল্টা জবাবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যে একাধিক হামলা চালিয়েছে।

সর্বশেষ সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি হামলার শিকার হয়েছে হরমুজ উপকূলের ইরানের বন্দর আব্বাস ও কেশম দ্বীপ। গতকালও বন্দর আব্বাসে দফায় দফায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এছাড়া উপকূলবর্তী বুশেহরসহ বিভিন্ন শহরেও হামলা চালানো হয়েছে। ওইদিন মার্কিন হামলায় ইরানে একই পরিবারের তিনজন সদস্য নিহত হন। সংঘাত শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশটিতে অন্তত ২০ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

এবারের সংঘাতে বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডান সবচেয়ে বেশি ইরানি হামলার শিকার হয়েছে। গতকাল জর্ডানে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোর। একইসঙ্গে বাহরাইনেও হামলা হয়েছে বলে জানা গেছে। ইরানের তাসনিম নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জর্ডান উপকূলে দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে ইরানি বাহিনী, যাতে একজন ভারতীয় নাবিক নিহত হয়েছেন।

পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যেই গত ১১ জুলাই হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিল ইরান। ইরানি বাহিনীর মুখপাত্র মোহাম্মদ আকরামিনিয়া জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের মুখে প্রণালিটি খোলা হবে না। তিনি বলেন, যুদ্ধ, কূটচাল ও মার্কিন আগ্রাসনের সামনে কখনোই হরমুজ খোলা হবে না এবং এই জলপথ নিয়ে ইরানি বাহিনী কোনো ছাড় দেবে না।