বর্তমান বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলো (LLM) মূলত ইংরেজি ভাষায় সবচেয়ে দক্ষ। ফলে বিশ্বের অন্যান্য প্রধান ভাষাগুলো, এমনকি ক্যানটনিজের মতো বহুল ব্যবহৃত ভাষাও প্রযুক্তির এই দৌড়ে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। মূলত ইংরেজি ভাষার ডিজিটাল তথ্যের প্রাচুর্য এই আধিপত্যের প্রধান কারণ, কারণ ইন্টারনেটের প্রায় অর্ধেক কন্টেন্ট ইংরেজি ভাষায়। বিপরীতে, অনেক ভাষা তথ্যের অভাবে 'লো-রিসোর্স ল্যাঙ্গুয়েজ' বা স্বল্প-সম্পদযুক্ত ভাষায় পরিণত হয়েছে।

এআই ডেভেলপারদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভাষাগত সূক্ষ্মতা এবং সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট বজায় রাখা। উদাহরণস্বরূপ, ক্যানটনিজ ভাষায় 'ডিম সাম' শব্দটির অর্থ একজন মানুষের কাছে স্পষ্ট হলেও মেশিনের জন্য এটি জটিল হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এআই অজানা শব্দের ক্ষেত্রে ভুল অনুবাদ তৈরি করে, যা কোনো স্থানীয় ভাষিক মানুষ ব্যবহার করেন না। সেন্টার অফ ডেমোক্রেসি অ্যান্ড টেকনোলজির সিনিয়র পলিসি অ্যানালিস্ট আলিয়া ভাতিয়া জানান, এআই যখন কোনো নির্দিষ্ট সংস্কৃতির শব্দ খুঁজে পায় না, তখন সেটি কাল্পনিক অনুবাদ তৈরি করে, যা ডেটাসেটে ভুল তথ্যের বিস্তার ঘটায়।

স্বল্প-সম্পদযুক্ত ভাষার তালিকায় শুধু বিলুপ্তপ্রায় ভাষাই নয়, বরং ভিয়েতনামীজ বা বাহাসা ইন্দোনেশিয়ার মতো কোটি কোটি মানুষের ব্যবহৃত ভাষাও অন্তর্ভুক্ত। এর পেছনে ইন্টারনেটের সীমিত প্রবেশাধিকার এবং বিভিন্ন দেশের সরকারি নিয়ন্ত্রণ বা সেন্সরশিপ দায়ী। ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশে অনলাইন কন্টেন্ট অপসারণের সুযোগ থাকায় অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় সংস্কৃতি ও প্রকৃত তথ্যের প্রতিফলন ডিজিটাল ডেটায় থাকে না। এছাড়া ল্যাটিন লিপির বাইরে অন্য লিপিতে লেখা ভাষা এবং টোনাল ফিচারযুক্ত ভাষায় এআই-এর পারফরম্যান্স অনেক দুর্বল।

এই বৈষম্য দূর করতে কিছু আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠান চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানি নেভার (Naver) তাদের 'হাইপারক্লোভা এক্স' (HyperCLOVA X) মডেলটি তৈরি করেছে, যা দাবি করা হচ্ছে GPT-4 এর তুলনায় ৬,৫০০ গুণ বেশি কোরিয়ান ডেটা দিয়ে প্রশিক্ষিত। এছাড়া ইন্দোনেশিয়ার টেলিকম অপারেটর ইনডোস্যাট এবং স্টার্টআপ গোটো যৌথভাবে একটি ৭০ বিলিয়ন প্যারামিটার বিশিষ্ট মডেল তৈরি করছে, যা বাহাসা ইন্দোনেশিয়ার পাশাপাশি জাভানিজ ও বালি-সহ আরও পাঁচ স্থানীয় ভাষায় কাজ করবে। তবে প্যারামিটারের বিশাল আকারের লড়াইয়ে তারা ওপেনএআই-এর GPT-4 বা ডিপসিক-এর R1 এর মতো জায়ান্টদের সাথে পাল্লা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভাষাগুলোর জন্য তৈরি SEA-LION প্রজেক্টের মডেলগুলো মাত্র ৩ থেকে ৭ বিলিয়ন প্যারামিটারের, যা ইংরেজি মডেলের তুলনায় অত্যন্ত ক্ষুদ্র।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো তথ্যের গুণগত মান। ক্যানটনিজ ভাষায় ডিজিটাল তথ্যের অভাব এবং বিদ্যমান তথ্যের নিম্নমানের কারণে এআই মডেলগুলো ভুল শব্দ বা ব্যাকরণ শিখছে। এছাড়া ডিজিটাল ডেটা মূলত আইনি নথি বা উইকিপিডিয়ার মতো আনুষ্ঠানিক লেখার দিকে ঝুঁকে থাকে, যার ফলে এআই-এর কথা বলার ধরন কৃত্রিম হয়ে পড়ে।

ডেটার ঘাটতি মেটাতে অনেক ডেভেলপার ইংরেজি কন্টেন্টকে অন্য ভাষায় অনুবাদ করে কৃত্রিম ডেটাসেট তৈরি করছেন। তবে এতে সাংস্কৃতিক পক্ষপাতিত্বের ঝুঁকি থাকে। জর্জিয়া টেক-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, আরবি ভাষায় প্রশিক্ষিত এআই মডেলগুলো অনেক সময় ইংরেজি অনুবাদ থেকে আসা পশ্চিমা মূল্যবোধ প্রতিফলিত করে, যা অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে ভুল বা সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। দীর্ঘমেয়াদে এআই-জেনারেটেড কন্টেন্ট আসল ডেটাকে দূষিত করতে পারে, যাকে বিশেষজ্ঞরা 'মডেল কোলাপস' হিসেবে অভিহিত করেছেন। এতে ভাষার বিশুদ্ধতা নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই যদি সত্যিই বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক এবং শিক্ষাগত সুযোগ তৈরি করতে চায়, তবে কেবল বড় টেক জায়ান্টদের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন অলাভজনক ও লাভজনক সংস্থাকে বহুভাষিক এআই গবেষণায় বিনিয়োগ করতে হবে। যাতে মানুষ তাদের নিজস্ব ভাষায় আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা ভোগ করতে পারে।