দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তি জায়ান্ট স্যামসাং তাদের বহুল প্রতীক্ষিত নতুন ভাঁজযোগ্য স্মার্টফোন ‘গ্যালাক্সি জেড ফোল্ড ৮’ বাজারে ছেড়েছে। এর আগে স্যামসাংয়ের ফোল্ডেবল ফোনগুলো ছিল লম্বাটে ও সরু, যা অনেক ব্যবহারকারী ‘টিভি রিমোট’ আকৃতির বলে সমালোচনা করেছিলেন। এবার সেই ধারা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে এসে সম্পূর্ণ নতুন এক নকশা নিয়ে হাজির হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ফোনটি গত ২২ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করা হয় এবং ৭ আগস্ট থেকে বিশ্বব্যাপী বাজারজাত শুরু হয়েছে।
নতুন এই ফোনের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৯০০ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। ফোনঅ্যারেনার এক জরিপে ৫২ শতাংশ পাঠক মত দিয়েছেন যে, এই নকশার মাধ্যমে স্যামসাং মূলত অ্যাপলের বহুল প্রতীক্ষিত আইফোন আলট্রার বিরুদ্ধে আগাম প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চেয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, অ্যাপল প্রথমে এই ধরনের নকশা নিয়ে কাজ করলেও স্যামসাং তাদের আগেই বাজারে ফোনটি এনে দিয়েছে। ফলে নতুন মডেলটির আগাম চাহিদা আগের মডেলের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। অবশ্য আইফোন আলট্রার বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি অ্যাপল।
নকশার দিক থেকে গ্যালাক্সি জেড ফোল্ড ৮-এ এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। ফোনটি ভাঁজ করা অবস্থায় মাত্র ৯.৭ মিলিমিটার পাতলা এবং ওজন মাত্র ২০১ গ্রাম। বাইরের দিকে ৫.৫ ইঞ্চির একটি অ্যামোলেড স্ক্রিন রয়েছে, যা চওড়া হওয়ায় এক হাতে ব্যবহার করা সহজ। ফোনের কাঠামো আর্মার অ্যালুমিনিয়াম ও টাইটানিয়ামের সংমিশ্রণে তৈরি, যা হঠাৎ পড়ে গেলে বা আঘাত লাগলে সুরক্ষা দেয়। তবে যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের কনজ্যুমার টেকনোলজি এডিটর স্যামুয়েল গিবস জানান, খাটো ও চওড়া আকৃতির কারণে ফোনটি হাতে নিলে ছোট নোটপ্যাডের মতো মনে হলেও এক হাতে ব্যবহার করা প্রায় অসম্ভব। বার্তা টাইপ বা স্ক্রল করতে হলে দুই হাতের প্রয়োজন হয়। বাইরের ৫.৫ ইঞ্চি পর্দায় কীবোর্ড খুললে তা অর্ধেকের বেশি জায়গা দখল করে নেয়, ফলে লেখার সময় খুব সামান্য অংশই দেখা যায়।
ফোনটি খুললে দেখা যায় ৪:৩ অনুপাতের ৭.৬ ইঞ্চির বড় পর্দা, যা দেখতে অনেকটা আইপ্যাড মিনির মতো। খ্যাতনামা টেক ইউটিউবার মার্কেস ব্রাউনলি এই পর্দার উজ্জ্বলতা ও আলোপ্রতিরোধী প্রলেপের প্রশংসা করেছেন। স্যামসাংয়ের নতুন ‘টাইটানিয়াম ফ্লেক্স হিঞ্জ’ পর্দার মাঝখানের ভাঁজ আড়াল করতে বেশ কার্যকর বলে তিনি মনে করেন। তবে মার্কেস একটি বড় যন্ত্রাংশগত কমতিও তুলে ধরেছেন—ফোনটিতে কোনো ‘ফ্লেক্স মোড’ বা অর্ধেক ভাঁজ করে রাখার সুবিধা নেই। স্প্রিংযুক্ত কবজাটি ফোনটিকে হয় পুরোপুরি বন্ধ, নয়তো পুরোপুরি খোলা রাখতে বাধ্য করে। ফলে টেবিলের ওপর ল্যাপটপের মতো করে এটি ব্যবহার করা যায় না।
নামকরণ নিয়েও কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। জিএসএমঅ্যারেনা জানিয়েছে, একদম নতুন ধরনের চওড়া ভাঁজযোগ্য ফোনটির নাম রাখা হয়েছে গ্যালাক্সি জেড ফোল্ড ৮, অন্যদিকে গত বছরের সরু গড়নের ফোল্ড ৭-এর প্রকৃত উত্তরসূরি হিসেবে বাজারে এসেছে ‘জেড ফোল্ড ৮ আলট্রা’। সাধারণ সচেতন ক্রেতারা ভুল করবেন না বলে মনে করলেও কেনার আগে এই পার্থক্য জেনে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে প্রযুক্তি ওয়েবসাইটটি।
কার্যক্ষমতার দিক থেকে ফোনটিতে ব্যবহার করা হয়েছে কোয়ালকমের নতুন ‘স্ন্যাপড্রাগন ৮ এলিট জেন ৫’ প্রসেসর। দ্য গার্ডিয়ানের মতে, ভারী গেম খেলা ও মাল্টিটাস্কিংয়ের জন্য এটি বর্তমানে অন্যতম দ্রুতগতির অ্যান্ড্রয়েড ফোন। বড় পর্দায় পাশাপাশি তিনটি অ্যাপ চালানো যাবে। স্যামসাং ২০৩৩ সাল পর্যন্ত সাত বছরের সফটওয়্যার ও নিরাপত্তা হালনাগাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সিলিকন কার্বন প্রযুক্তির কারণে এত পাতলা ফোনেও ৪৮০০ মিলিঅ্যাম্পিয়ারের বড় ব্যাটারি রাখা সম্ভব হয়েছে, যা সাধারণ ব্যবহারে টানা ৪০ ঘণ্টা চলে। ৪৫ ওয়াটের চার্জারে মাত্র ৬৫ মিনিটে ফুল চার্জ হয় এবং ২০ ওয়াটের ওয়্যারলেস চার্জিংও সমর্থন করে।
মুগ্ধতার প্রথম পর্ব পেরোলে কিছু সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ফোনটি বন্ধ থাকলে স্পিকার দুটি চমৎকার স্টেরিও সাউন্ড দিলেও খোলার পর দুটি স্পিকারই স্ক্রিনের বাঁ পাশে চলে যায়। ফলে আড়াআড়িভাবে ভিডিও দেখার সময় শব্দ কেবল এক পাশ থেকে আসে। পাতলা গড়নের কারণে এতে কোনো ডেডিকেটেড টেলিফটো লেন্স রাখা হয়নি; পেছনে রয়েছে কেবল ৫০ মেগাপিক্সেলের প্রাইমারি ও ৫০ মেগাপিক্সেলের আলট্রা-ওয়াইড লেন্স। দ্য গার্ডিয়ান এই দামের ফোনের তুলনায় ক্যামেরাকে ‘অত্যন্ত সাধারণ মানের’ বলেছে এবং কম আলোতে ছবির তীক্ষ্ণতা কমে যাওয়ার কথাও উল্লেখ করেছে। ফোনটিতে কোনো বিল্ট-ইন ম্যাগনেট না থাকায় গাড়ির তারহীন চার্জারে বসানোও ঝামেলার।




