বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর দৌড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের একচেটিয়া আধিপত্যের মাঝে ইন্দোনেশিয়ার নিজস্ব অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছে ইনডোস্যাট ওরুডো হাচিসন (IOH)। প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বিক্রম সিনহা মনে করেন, মার্কিন বা চীনা ল্যাবে তৈরি এআই মডেলগুলো ইন্দোনেশিয়ার স্বতন্ত্র সংস্কৃতি এবং ভাষার জটিলতা পুরোপুরি বুঝতে পারে না। ফলে স্থানীয় প্রেক্ষাপটে কার্যকর সমাধান পেতে হলে নিজস্ব এআই-এর বিকল্প নেই। এই লক্ষ্যেই তারা 'সাহাবাত এআই' (Sahabat AI) নামে একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে, যা স্থানীয় স্টার্টআপগুলোকে সহায়তা করবে।

বিক্রম সিনহার মতে, এআই-এর পরবর্তী ধাপ হবে ব্যবহারকারীর খুব কাছাকাছি বা 'এজ' (edge) লেভেলে মডেল চালানো, যা স্থানীয় ভাষায় স্থানীয় সমস্যার সমাধান দেবে। তিনি একে 'সোভেরেন এআই' বা সার্বভৌম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে এই সার্বভৌমত্বকে একটি লাভজনক ব্যবসায়িক মডেলে রূপান্তর করা এখনও একটি চ্যালেঞ্জ। সিনহা স্বীকার করেছেন যে, তার দলের সদস্যরা এখনও সাহাবাত এআই-এর জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ব্যবসায়িক ভিত্তি বা 'বিজনেস কেস' তৈরি করতে হিমশিম খাচ্ছেন। তা সত্ত্বেও তিনি মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে এর প্রয়োজনীয়তা প্রমাণিত হবে।

ইনডোস্যাটের এই মহাপরিকল্পনা কেবল সফটওয়্যারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তারা এনভিডিয়ার (Nvidia) সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে জিপিইউ-অ্যাজ-এ-সার্ভিস (GPU-as-a-service) প্রদান করছে, যা ব্যাংক এবং খনি শিল্পের মতো খাতের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রসেসিং পাওয়ার সরবরাহ করবে। এনভিডিয়ার H100 প্রসেসরের মাধ্যমে তারা একটি 'এআই ফ্যাক্টরি' গড়ে তুলেছে। সিনহার দাবি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোর জমি, পানি এবং বিদ্যুতের সহজলভ্যতা এই অবকাঠামো নির্মাণে বাড়তি সুবিধা প্রদান করে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, কেবল বিনিয়োগ বা অর্থ দিয়ে সার্বভৌমত্ব অর্জন সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ।

সাহাবাত এআই-এর বিশেষত্ব হলো এটি ইন্দোনেশিয়ার রাইড-শেয়ারিং জায়ান্ট গো-টু (GoTo)-র সহযোগিতায় তৈরি একটি ওপেন সোর্স লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (LLM)। এটি বাহাসা ইন্দোনেশিয়া এবং বাতাকসহ স্থানীয় ভাষায় দক্ষ। সিনহার মতে, কোনো লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল কখনোই নিরপেক্ষ হয় না; তাই স্থানীয় ভাষায় তৈরি মডেল না হলে তাতে সাংস্কৃতিক পক্ষপাতিত্ব থাকার সম্ভাবনা থাকে। যদিও ডিজিটাল টেক্সটের অভাবের কারণে স্থানীয় ভাষায় মডেল তৈরি করা কঠিন, তবুও সঠিক তথ্যের নির্ভুলতার জন্য এটি অপরিহার্য।

ব্যবসায়িক দিক থেকে ইনডোস্যাট বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে। ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি ৫৬.৫ ট্রিলিয়ন ইন্দোনেশীয় রুপিয়া (৩.৩ বিলিয়ন ডলার) রাজস্ব অর্জন করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১.১ শতাংশ বেশি। মুনাফা ১২.২ শতাংশ বেড়ে ৫.৫ ট্রিলিয়ন রুপিয়ায় পৌঁছেছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে এই প্রবৃদ্ধি আরও ত্বরান্বিত হয়ে রাজস্ব ১২.১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সামগ্রিক বাজার মন্দার কারণে এবং টেক সেক্টরে 'ইউনিকর্ন' স্টার্টআপগুলোর ভুল মেট্রিক অনুসরণ করার ফলে বিনিয়োগকারীদের মাঝে কিছুটা হতাশা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সিনহা টেকসই ব্যবসায়িক মডেল তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করছেন।