মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেয়ি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষরকে 'অর্থহীন ও অবৈধ' আখ্যা দিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে হামলা চালিয়ে যায় তবে তাদের 'অবিস্মরণীয় শিক্ষা' দেওয়া হবে। একই দিনে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে জানান, প্রায় এক মাস আগে স্বাক্ষরিত সাময়িক চুক্তির বাধ্যবাধকতা থেকে সরে আসছে তেহরান, কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। এর ফলে যুদ্ধ স্থায়ীভাবে শেষ করার আরেকটি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলো।
শনিবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, জর্ডানে মার্কিন ও মিত্র বাহিনীর একটি ঘাঁটিতে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত এবং একজন নিখোঁজ হয়েছেন। আহত চার সেনাকে জর্ডানের হাসপাতালে নেওয়া হলেও পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। নিহতদের পরিচয় এখনও প্রকাশ করা হয়নি। মার্কিন কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, গত সোমবার থেকে এখন পর্যন্ত আরও ১৩ মার্কিন সেনা—১০ সেনা ও ৩ নৌবাহিনী সদস্য—আহত হয়েছেন। যুদ্ধ শুরুর পর মোট ১৬ মার্কিন সেনা নিহত ও ৪৩০ জনের বেশি আহত হয়েছে।
ইরানের হামলায় কুয়েতে সবচেয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতি দেখা গেছে। কুয়েত কর্তৃপক্ষ ও কুয়েত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন জানিয়েছে, দেশটির একটি পানিশোধনাগার ও একটি তেল স্থাপনায় হামলা চালানো হয়। তেল স্থাপনায় বেশ কয়েকজন আহত হন এবং পানিশোধনাগারের আগুনের ফলে বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। কুয়েত ফায়ার ফোর্স জানিয়েছে, আরও দুটি অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে গিয়ে বেশ কয়েকজন দমকলকর্মী ও একজন শ্রমিক আহত হয়েছেন। কুয়েত তার আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় এবং কুয়েত এয়ারওয়েজ অধিকাংশ ফ্লাইটের সময়সূচি পরিবর্তন করে। অন্যদিকে, ইরাক জানিয়েছে তারা ইরবিল শহরের ওপর ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করেছে। জর্ডানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা পেট্রা জানিয়েছে, দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছে। বাহরাইনে দিনে একাধিকবার এবং সৌদি আরবে সকালে বিমান হামলার সাইরেন বেজেছে। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সেক্রেটারি জেনারেল জাসেম মোহাম্মদ আল-বুদাইউই অবকাঠামো ও বেসামরিক স্থাপনায় হামলাকে যুদ্ধাপরাধ বলে অভিযুক্ত করেছেন।
মার্কিন বাহিনী টানা সপ্তম রাত ধরে ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাচ্ছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, হামলায় নজরদারি স্থান, সামরিক সরবরাহ পরিকাঠামো, ভূগর্ভস্থ অস্ত্রাগার ও সামুদ্রিক সক্ষমতা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, বোনজি পানিশোধনাগার সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে, যার ফলে প্রায় ১০ হাজার মানুষের পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত কেশম দ্বীপের একটি শোধনাগারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, বিমান হামলায় একটি বিদ্যুৎ ও পানিশোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং হামলায় বন্দর আব্বাসের দিকে যাওয়া প্রধান মহাসড়কের টানেল ও সেতুও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের জ্বালানি মন্ত্রণালয় শুক্রবার প্রথমবারের মতো স্বীকার করে যে বিদ্যুৎ পরিকাঠামোতে হামলা হয়েছে এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের আহ্বান জানায়। ইরানের কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, গত তিন সপ্তাহে মার্কিন হামলায় ইরানে কমপক্ষে ৫০ জন নিহত ও ৫০০ জনের বেশি আহত হয়েছে, যার মধ্যে শুক্রবার একটি সেতুতে হামলায় ৮ জন নিহত হয়। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, যেসব দেশ মার্কিন বাহিনীকে আশ্রয় দিচ্ছে তাদের উপযুক্ত জবাব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
হরমুজ প্রণালী নিয়ে বিরোধ চরম আকার ধারণ করেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান কার্যকরভাবে এই প্রণালী শিপিং ট্রাফিকের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে, যার ফলে জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপক বেড়েছে। ইরান দাবি করছে, প্রণালীটি তার একক নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত এবং জাহাজগুলোকে তেহরানকে ফি দিতে হবে। অন্যদিকে বিশ্ব দীর্ঘদিন ধরে এটিকে আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। ইরান সাম্প্রতিক দিনগুলোতে জাহাজে গুলি চালিয়েছে এবং প্রণালী দিয়ে যাতায়াত গত তিন সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমে এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানকে প্রণালী শিথিল করতে বাধ্য করতে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুতে হামলার হুমকি দিয়েছেন এবং গত সপ্তাহে মার্কিন বাহিনী ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ পুনরায় আরোপ করেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় বসছিল, কিন্তু এখন ট্রাম্পের ওপর যুদ্ধ শেষ করার ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এড়ানোর রাজনৈতিক চাপ বেড়েছে।


