বিদেশে চাকরির লোভনীয় প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশিকে কম্বোডিয়া, মিয়ানমার ও ভিয়েতনামের স্ক্যাম কম্পাউন্ডে আটকে রাখা হচ্ছে। সেখানে তাদের আক্ষরিক অর্থেই 'বিক্রি' করে দেওয়া হচ্ছে প্রতারকচক্রের হাতে। প্রতিশ্রুত কাজের বদলে তাদের দিয়ে অনলাইনে মানুষকে প্রতারণার কাজ করানো হচ্ছে। কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের ওপর চলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। দেশে ফিরে এসেও দেনার দায়ে অনেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। আন্তর্জাতিক মানব পাচারবিরোধী দিবস ২০২৬-এর প্রাক্কালে এই পরিস্থিতি নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
প্রতারণার এই জালে জড়িয়ে পড়ার কাহিনী বর্ণনা করেছেন রাজবাড়ীর আলামিন মিয়া। তিনি জানান, ফেসবুক-ইউটিউবে ভিয়েতনামে রেস্তোরাঁয় চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে এমআর ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি রিক্রুটিং এজেন্সির সাথে যোগাযোগ করেন। এজেন্সির কর্মীরা তাকে এবং তার ভাগ্নি জাহিদা শেখকে মাথাপিছু পাঁচ লাখ টাকায় ভিয়েতনামে নেওয়ার কথা বলে। কিন্তু পরে জানানো হয়, তাদের জন্য কম্বোডিয়ায় চাকরির ব্যবস্থা করা হয়েছে। আলামিন বলেন, তাদের ভুয়া এমপ্লয়মেন্ট ভিসা দেওয়া হয় এবং বিএমইটির স্মার্ট কার্ড করিয়ে দেওয়া হয়। টিকেটেও জালিয়াতি করা হয়।
২০২৫ সালের ৮ নভেম্বর নমপেনে পৌঁছানোর পর ইমিগ্রেশন পুলিশ তাদের আটকে দেয়। পরে এজেন্ট গোলাম মোস্তফা মুকুলের নির্দেশে তাদের কাছ থেকে আরও ১২০০ ডলার করে নেওয়া হয়। আলামিন জানান, তাদের ট্যুরিস্ট ভিসা দেওয়া হয় এবং পরে একটি চীনা স্ক্যাম সেন্টারে 'বিক্রি' করে দেওয়া হয়। সেখানে তাকে ভুয়া ফেসবুক আইডি খুলে মানুষের নম্বর সংগ্রহ করতে বলা হয়। কাজ না করায় নির্যাতনের শিকার হন তিনি। পরে পরিবারের কাছ থেকে টাকা এনে নিজেকে ছাড়িয়ে নেন। দেশে ফিরেও তার দৈনন্দিন জীবন দেনার দায়ে অতিষ্ঠ। প্রতিমাসে ৫৩ হাজার টাকা কিস্তি পরিশোধ করতে না পেরে তাকে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে।
শরীয়তপুরের মন্নান ছৈয়ালের ঘটনাও একই রকম। প্রতিবেশী মানিক শেখের মাধ্যমে তার ভাই রবিন শেখের সাথে পরিচয় হয়। রবিন তাকে পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে কম্বোডিয়ায় রেস্টুরেন্টে চাকরির প্রস্তাব দেয়। মাসিক ৭০ হাজার টাকা বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে তাকে কম্বোডিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে একটি চীনা স্ক্যাম কম্পাউন্ডে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ইনস্টাগ্রাম আইডি খুলে মানুষের সাথে প্রতারণা করার নির্দেশ দেওয়া হয়। কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে নির্যাতন করা হয়, আয়নাঘরে আটকে রাখা হয় এবং খাবার দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়। কম্বোডিয়া পুলিশের অভিযানে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি দেশে ফিরে আসেন। বর্তমানে মিথ্যা মামলার ভয়ে তিনি নিজ এলাকায় যেতে পারছেন না। তার বাবাকে ২৬ দিন জেল খাটতে হয়েছে।
মানিকগঞ্জের তালাত মাহমুদ পূর্বপরিচিত একজনের মাধ্যমে ডেটা এন্ট্রি ও কুরিয়ার সার্ভিসের কাজের জন্য কম্বোডিয়ায় যান। সেখানেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। চীনা কোম্পানিতে কাজ করতে গিয়ে বুঝতে পারেন তাকেও 'বিক্রি' করা হয়েছে। কাজ করতে না চাইলে নির্যাতনের শিকার হন। পরে ব্র্যাকের সহায়তায় দেশে ফিরে আসেন। বর্তমানে তার প্রায় ৬ লাখ টাকা ঋণ রয়েছে এবং চাকরির সন্ধান করছেন।
ব্র্যাকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ফিরে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে ৯৮ শতাংশই চাকরির প্রতিশ্রুতি পেলেও কোনো চাকরি পাননি। ৯০ শতাংশকে জোর করে প্রতারণার কাজে যুক্ত করা হয়েছিল। ৮৮ শতাংশের চলাফেরার স্বাধীনতা ছিল না এবং ৮৬ শতাংশের পাসপোর্ট ও কাগজপত্র কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। ২৭ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
আন্তর্জাতিক মানব পাচারবিরোধী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘প্রতারণার ফাঁদে বন্দি’। ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কর্মকর্তারা এই প্রতারণাকে ‘আধুনিক দাসপ্রথা’ হিসাবে বর্ণনা করেছেন। ভুক্তভোগীরা দেশে ফিরে মামলা করলেও মূল আসামিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। পাল্টা মামলার ভয়ে অনেকে এখন এলাকায় যেতে পারছেন না। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।




