আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও বৃদ্ধি পেয়েছে। সোমবার (১০ আগস্ট) সকাল ৭টা ১৫ মিনিটে (পূর্বাঞ্চলীয় সময়) ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেল প্রতি ব্যারেল বিক্রি হয়েছে ৮৭.৫৫ ডলারে। গতকালের তুলনায় এ দাম ১১ সেন্ট বেশি। এক মাস আগে এই দাম ছিল ৭৬.৪৭ ডলার, অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ১৪.৪৮ শতাংশ। আর এক বছর আগে তেলের দাম ছিল ৬৬.৮২ ডলার, সেই হিসাবে বছরের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ৩১.০২ শতাংশ।

তেলের দাম ভবিষ্যতে কী হবে তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। সাধারণত সরবরাহ ও চাহিদার ওপর ভিত্তি করেই দাম নির্ধারিত হয়, তবে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক মন্দা বা অন্য যেকোনো সংকটের সময় দামের গতিপথ দ্রুত বদলে যেতে পারে। পাম্পে জ্বালানির দাম শুধু অপরিশোধিত তেলের ওপর নির্ভর করে না। পরিশোধনাগার, পাইকারি ব্যবসায়ী, স্থানীয় পাম্প মালিকদের মার্জিন এবং সরকারি করও এর অংশ। তবে চূড়ান্ত দামের অর্ধেকের বেশি নির্ধারণ করে অপরিশোধিত তেলের দামই। তাই তেলের দাম বাড়লে জ্বালানির দামও বাড়ে, আর তেলের দাম কমলেও ভোক্তারা সেই সুবিধা পান ধীরে ধীরে।

জরুরি অবস্থা মোকাবিলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি কৌশলগত তেল মজুদ রয়েছে, যা স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ নামে পরিচিত। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নিষেধাজ্ঞা বা যুদ্ধের মতো পরিস্থিতিতে এই মজুদ থেকে জ্বালানি সরবরাহ করা হয়। সরবরাহে ধাক্কা লাগলে দাম যাতে অসহনীয়ভাবে না বাড়ে, সেই চেষ্টায় এই রিজার্ভ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যদিও এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয় বরং জরুরি মুহূর্তে স্বস্তি দিতে পারে।

তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দামের মধ্যে একটি সম্পর্ক আছে। তেলের দাম বাড়লে কিছু শিল্প প্রতিষ্ঠান যেখানে সম্ভব, সেখানে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহারের দিকে ঝুঁকে পড়ে, যার ফলে গ্যাসের চাহিদা বেড়ে যায়। তেলের দামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই বাজার কখনো স্থির ছিল না। ১৯৭০-এর দশকের শুরুর দিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও তেল নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রথম বড় ধাক্কা আসে। ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি চাহিদা কমে যাওয়ায় এবং অ-ওপেক দেশগুলোর উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় দাম পড়ে যায়। ২০০৮ সালে চাহিদা বৃদ্ধির কারণে দাম আকাশচুম্বী হয়, তবে বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের কারণে তা আবারও ভেঙে পড়ে। ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারির সময় লকডাউনে তেলের চাহিদা একেবারে ধসে পড়ে, তখন প্রতি ব্যারেলের দাম ২০ ডলারের নিচে নেমে যায়।

অপরিশোধিত তেলের দাম নির্ধারণে মূলত সরবরাহ ও চাহিদার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে সম্ভাব্য খবরও ভূমিকা রাখে। ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি এবং ওপেক প্লাসের সিদ্ধান্তগুলো এর মধ্যে অন্যতম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সরকারের নীতি অনুযায়ীও দাম ওঠানামা করে। ২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন আর্কটিক ন্যাশনাল ওয়াইল্ডলাইফ রিফিউজের উপকূলীয় সমভূমিতে ১৫ লাখ একরের বেশি জমিতে তেল-গ্যাস উত্তোলনের অনুমতি দেয়, যা পূর্ববর্তী প্রশাসনের সীমিত নীতির বিপরীত। দাম যখন বাজার চালু থাকে, তখন সারাদিনই পরিবর্তিত হতে থাকে। ফিউচার মার্কেটে মানুষ ভবিষ্যতে তেল কেনা-বেচার চুক্তি করে, যতক্ষণ চুক্তি চলতে থাকে, ততক্ষণ দাম বদলাতে থাকে। মার্কিন শেল তেল উৎপাদন বাড়লে দেশটির জ্বালানি সরবরাহ বাড়ে, যার ফলে দামের চাপ কিছুটা কমতে পারে। তেলের দাম বেড়ে গেলে সাধারণ পণ্যের দামও বেড়ে যায়। পরিবহন খরচ বৃদ্ধির কারণে মুদি দোকান থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দামে তার প্রভাব পড়ে, ফলে মূল্যস্ফীতিও বেড়ে যায়।