ভৈরব-মেন্দিপুর সড়কের রসুলপুর গ্রাম এলাকায় যানবাহন চলাচল এখন প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। মাত্র এক কিলোমিটার পথে রয়েছে ৩৪টি গতিরোধক, অর্থাৎ প্রতি ২৯ মিটার পর পর একটি করে গতিরোধক পেরোতে হচ্ছে চালকদের। একটি গতিরোধক অতিক্রম করার পরেই চোখে পড়ে আরেকটি, ফলে যানবাহনের গতি স্বাভাবিক রাখা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পুরো ১৪ দশমিক ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কে মোট গতিরোধকের সংখ্যা ৭৭টি, যার ফলে চরম দুর্ভোগের মুখে পড়েছেন যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকরা।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, রসুলপুর গ্রামের দুই পাশে অবস্থিত ভবানীপুর ও সাদেকপুর গ্রামেও গতিরোধকের ছড়াছড়ি। দেড় কিলোমিটার দূরত্বের ভবানীপুর অংশে ১৫টি এবং তিন কিলোমিটার দূরত্বের সাদেকপুরে ১২টি গতিরোধক রয়েছে। এছাড়াও সড়কটির মেন্দিপুরে দুটি, তেয়ারিচরে একটি, শিমুলকান্দিতে চারটি, মধ্যেরচরে দুটি, দড়িচণ্ডীবেরে দুটি এবং স্টেডিয়াম এলাকায় পাঁচটি গতিরোধক বসানো হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভৈরবের অন্য কোনো সড়কে এত কম দূরত্বে এত সংখ্যক গতিরোধক নেই, এমনকি একই সড়কের অন্য গ্রামগুলোতেও এই চিত্র দেখা যায় না।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের ভৈরব সড়ক উপবিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী ফরিদুল ইসলাম জানান, কোনো গতিরোধকই তাদের ইচ্ছায় তৈরি হয়নি। গ্রামবাসীর চাপে পড়ে সেগুলো বসাতে হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, এখন এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে, কারও বাড়ির সামনে গতিরোধক না থাকলে সেটি যেন সম্মানের অভাব হিসেবে বিবেচিত হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সাগর বিল্ডার্সের ব্যবস্থাপক আনোয়ার হোসেন বলেন, রসুলপুরের এই প্রবণতা আশপাশের ভবানীপুর ও সাদেকপুর গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানকার বাসিন্দারাও ধীরে ধীরে গতিরোধককে মর্যাদার প্রতীক হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন। জোর করে তাঁদের মাধ্যমে এসব গতিরোধক নির্মাণ করানো হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, সড়কটি সংস্কারের পর একজন বয়স্ক ব্যক্তি তাঁর বাড়ির সামনে গতিরোধক নির্মাণের অনুরোধ জানান। তাঁর যুক্তি ছিল, মসৃণ সড়কে গাড়ির গতি বেড়ে যাবে, যা শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এরপরই শুরু হয় প্রতিযোগিতা। কেউ দেখেন অন্যের বাড়ির সামনে গতিরোধক আছে, অথচ তাঁর নেই — এই ভাবনা থেকেই একের পর এক গতিরোধক বসানোর দাবি উঠতে থাকে। একপর্যায়ে রসুলপুর গ্রামে গতিরোধক স্থাপন সামাজিক প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে দাঁড়ায়।
স্থানীয় অটোরিকশা চালক সমিতির তথ্যমতে, এই সড়কে প্রায় ৯৫টি সিএনজিচালিত অটোরিকশা এবং শতাধিক ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করে। চালকদের অভিযোগ, অতিরিক্ত গতিরোধকের কারণে গাড়ির যন্ত্রাংশ দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং মেরামত খরচ বেড়ে গেছে। ব্যাটারিচালিত রিকশার চালক জসিম মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এগুলো গতিরোধক নয়, নিছক জুলুম। তিনি আরও বলেন, গতিরোধক না থাকলে প্রতিদিন অন্তত ২০০ টাকা বেশি আয় করা সম্ভব হতো।
যাত্রীরাও এই পরিস্থিতিতে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন, বিশেষ করে বৃদ্ধ ও গর্ভবতী নারীরা সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছেন। সাদেকপুর গ্রামের হাতেখড়ি কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক শবনম আক্তার বলেন, ঘন ঘন গতিরোধকের কারণে তাদের নিত্যদিনের দুর্ভোগের যেন অন্ত নেই। রসুলপুর গ্রামে ‘রনুর বাড়ি’র সামনে মাত্র ৩০ ফুটের মধ্যে তিনটি গতিরোধক দেখা গেছে। স্থানীয় দোকানি রহমত উল্লাহ বলেন, এসব গতিরোধক প্রয়োজনীয়, নইলে ছেলেমেয়েরা গাড়ির নিচে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সড়কটি সংস্কারকাজের সঙ্গে জড়িত একাধিক ব্যক্তি জানান, গতিরোধক নিয়ে গ্রামবাসীর সঙ্গে তাদের বিরোধ দেখা দেয় এবং একপর্যায়ে কাজ বন্ধও হয়ে যায়। পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গ্রামবাসীর দাবি মেনে নিয়ে কাজ সম্পন্ন করে। সাগর বিল্ডার্সের ব্যবস্থাপক আনোয়ার হোসেন আরও বলেন, গতিরোধক নির্মাণে রাজি না হলে তাদের মারধরের হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
গতিরোধকগুলোর অনেকগুলোর দুই পাশে সাদা রং করা থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা নেই। ফলে দূর থেকে চালকদের পক্ষে গতিরোধক শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই সমস্যার সমাধানে চালকরা আন্দোলন, জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদনও করেছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কে এম মামুনুর রশীদ বলেন, সওজের সঙ্গে আলোচনা করে এই সমস্যার সমাধানের উপায় খোঁজা হবে। তিনি মনে করেন, প্রতি বাড়ির সামনে গতিরোধক রাখার এই সংস্কৃতি থেকে গ্রামবাসীকে বের করে আনতে হবে, নতুবা এই প্রবণতা আশপাশের অন্যান্য গ্রামেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।




