ইসলামের ইতিহাসে পিতা-কন্যার সম্পর্কের এক উজ্জ্বল ও অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর প্রিয় কন্যা ফাতেমা (রা.)। ধৈর্য, ত্যাগ, বিনয় এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা — এই গুণগুলোতে বিভূষিত ছিলেন ফাতেমা (রা.), যিনি মুসলিম নারী সমাজের জন্য চিরকালের আদর্শ হয়ে আছেন। ইবাদত, তাকওয়া ও চারিত্রিক সৌন্দর্যে তিনি ছিলেন সবার থেকে স্বতন্ত্র। রাসুল (সা.) নিজে ঘোষণা করেছেন, ‘ফাতেমা জান্নাতি নারীদের প্রধান হবেন।’ (সুয়ুতি, জামেউস সাগির, হাদিস: ৫৮১৭) তাঁর জীবন প্রতিটি মানুষের জন্য, বিশেষ করে নারীদের জন্য অনন্য শিক্ষণীয়।
মক্কায় ইসলামের সূচনালগ্নে কঠিন এক সময় পার করছিলেন রাসুল (সা.)। নবুয়ত লাভের পর প্রথম তিন বছর প্রকাশ্যে দাওয়াত দেওয়ার নির্দেশ না থাকায় তিনি চুপচাপ ছিলেন। এরপর যখন আত্মীয়স্বজন ও মক্কাবাসীদের এক আল্লাহর ইবাদতের আহ্বান জানানো শুরু হলো, তখন কোরাইশ নেতারা তীব্র বিরোধিতা শুরু করে। এমনকি তাঁর নিজ চাচা আবু লাহাবও ইসলামবিরোধী অবস্থান নেন। এরই মাঝে রাসুলের জীবনে নেমে আসে আরেক গভীর বেদনা — তাঁর পুত্রসন্তানেরা শৈশবেই ইন্তেকাল করেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুশরিকরা কটূক্তি শুরু করে; বিশেষ করে আস ইবনে ওয়ায়েল তাঁকে ‘আবতার’ বা নির্বংশ বলে বিদ্রূপ করত, কারণ তাদের ধারণা ছিল মৃত্যুর পর তাঁর নাম-নিশানাও বিলীন হয়ে যাবে। (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ৬/৫০৮) এমন হৃদয়বিদারক পরিস্থিতিতে আল্লাহ সুরা কাউসার অবতীর্ণ করে সান্ত্বনা দেন এবং ঘোষণা করেন, ‘নিশ্চয়ই আপনার শত্রুই নির্বংশ।’ (সুরা কাউসার, আয়াত: ৩) ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আল্লাহর এই ঘোষণা বাস্তবে প্রতিফলিত হয়েছে। রাসুলকে যারা ‘আবতার’ বলেছিল, তারাই প্রকৃত অর্থে কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়েছে; অন্যদিকে আল্লাহর ইচ্ছায় ফাতেমার মাধ্যমেই রাসুলের পবিত্র বংশধারা পৃথিবীতে অব্যাহত রয়েছে।
প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর বহু খ্যাতিমান সাহাবি ফাতেমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেও দ্বিতীয় হিজরিতে তাঁর চাচাতো ভাই আলী (রা.)-এর সঙ্গে বিয়ে সম্পন্ন করেন রাসুল (সা.)। মোহর নির্ধারিত হয়েছিল প্রায় চার শ আশি দিরহাম। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২১২৬) এই বিয়ে ছিল সরলতা ও বরকতের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কন্যাকে বিদায়ের সময় নবীজি যে সামগ্রী দিয়েছিলেন তাতে ছিল একটি চাদর, খেজুরগাছের আঁশভর্তি বালিশ, চামড়ার বিছানা, দড়ির খাট, একটি মশক ও জাঁতা। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৮৫৩) এ থেকে প্রতীয়মান হয়, ইসলামে দাম্পত্য জীবনের সৌন্দর্য বিলাসিতার মধ্যে নয়, বরং তাকওয়া, ভালোবাসা ও পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্যে নিহিত।
পিতা-কন্যার এই সম্পর্ক ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘ফাতেমা আমারই একটি অংশ। যে তাকে কষ্ট দিল, সে আমাকে কষ্ট দিল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৭১৪) জীবনের শেষ সময়ে তাঁর জীবিত সন্তানদের মধ্যে একমাত্র ছিলেন ফাতেমা। মৃত্যুশয্যায় কন্যাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমার পরিবারের মধ্যে তুমিই প্রথম আমার সঙ্গে মিলিত হবে।’ (বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ৭২৫) তাঁর এই ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হয় — ১১ হিজরিতে রাসুলের ইন্তিকালের ছয় মাসের মধ্যেই ফাতেমা (রা.) ইন্তেকাল করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩০৯২)
মক্কাজীবনের এক হৃদয়স্পর্শী ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। একদিন নবীজি কাবা শরিফের পাশে সেজদারত অবস্থায় ছিলেন। তখন অভিশপ্ত উকবা ইবনে আবি মুআইত উটের পচা নাড়িভুঁড়ি এনে তাঁর পবিত্র পিঠে ফেলে দেয়, আর দূরে দাঁড়িয়ে কোরাইশ নেতারা তা দেখে হাসাহাসি করছিল। নবীজি সেজদা থেকে মাথা তুলতে পারছিলেন না। খবর পেয়ে ছোট্ট ফাতেমা দৌড়ে সেখানে আসেন এবং নিজ হাতে পিতার পিঠ থেকে সেই নোংরা নাড়িভুঁড়ি সরিয়ে দেন। এরপর তিনি মুশরিকদের প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪০)
রাসুল (সা.)-এর নিয়মিত অভ্যাস ছিল, কোনো সফর থেকে ফিরে প্রথমে মসজিদে গিয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করা, এরপর সবার আগে প্রিয় কন্যা ফাতেমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করা। (ইবনে হাজার আসকালানি, হিদায়াতুর রুওয়াত, ৪/২৪৭) এ থেকে বোঝা যায়, ব্যস্ততম জীবন, রাষ্ট্র পরিচালনা কিংবা দাওয়াতি কাজের মাঝেও পরিবারকে সময় দেওয়া এবং সন্তানদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত। একবার সফর থেকে ফিরে এসে রাসুলকে স্বাগত জানাতে এগিয়ে এলে ফাতেমা (রা.) তাঁর ক্লান্ত চেহারা ও জীর্ণ পোশাক দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তখন নবীজি তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, ‘কেঁদো না, ফাতেমা। আল্লাহ তোমার পিতাকে এমন এক ধর্ম দিয়ে পাঠিয়েছেন, যা একদিন পৃথিবীর প্রতিটি কাঁচা-পাকা ঘরে পৌঁছে যাবে।’ (তাবরানি, আল-মুজামুল কাবির, ২২/২২৫) আজ বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশে ইসলামের উপস্থিতি ও কোটি মানুষের ইমান এই ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতার সাক্ষ্য বহন করছে।
পিতা-মাতার প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান সন্তানের সর্বোচ্চ গুণ। বর্তমান সমাজে যেখানে পারিবারিক বন্ধন ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে, সেখানে ফাতেমা (রা.)-এর জীবন প্রতিটি পরিবারের জন্য, বিশেষ করে মুসলিম নারীদের জন্য অনুকরণীয়। তাঁর চরিত্র, ইবাদত, আত্মত্যাগ এবং পিতার প্রতি অগাধ ভালোবাসা আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক মজবুত করতে অনুপ্রেরণা জোগায়।




