ইরানের অর্থনীতির জীবনীশক্তি পারস্য উপসাগরীয় বাণিজ্যপথ। সাম্প্রতিক মার্কিন নৌ-অবরোধ কার্যকরের পরিপ্রেক্ষিতে তেহরান প্রশাসন এই পথে নিজেদের জাহাজ চলাচল ধরে রাখতে নানা গোপন কৌশল গ্রহণ করছে। গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে নতুন করে অবরোধ আরোপ করলেও তার আগেই প্রস্তুতি শুরু করেছিল দেশটি।

সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান উইন্ডওয়ার্ড ইন্টেলিজেন্সের পর্যবেক্ষণ বলছে, হরমুজ প্রণালিতে বর্তমানে ইরানের ২৩টি জাহাজ সন্দেহজনক আচরণ করছে। এরা ভুয়া পতাকা ব্যবহার করছে এবং নিজেদের অবস্থান শনাক্তকারী ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এ ধরনের নৌযানকে 'ডার্ক ভেসেল' বা 'শ্যাডো ফ্লিট' নামে চিহ্নিত করা হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েই এই কৌশল নিয়েছে ইরান।

আইএমএফের সাবেক উপপরিচালক ও পিটারসন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো আদনান মাজারেই জানান, বছরের পর বছর ধরে নামসর্বস্ব কোম্পানি ও অস্পষ্ট আর্থিক লেনদেনের একটি জটিল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে ইরান। এসব গোপন জাহাজ চীনে সবচেয়ে বেশি তেল বিক্রি করে। উদাহরণস্বরূপ, উইন্ডওয়ার্ডের নজরদারিতে থাকা একটি ইরানি ট্যাংকার খারগ দ্বীপ থেকে তেল বোঝাই করে সরাসরি না গিয়ে ইরাকের বসরা টার্মিনাল হয়ে চীনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। আসল উৎস লুকাতেই এই ঘোরানো পথ বেছে নেওয়া হয়।

উইন্ডওয়ার্ডের তথ্যমতে, চিহ্নিত ২৩টি জাহাজের মধ্যে ১০টিতে বর্তমানে অপরিশোধিত তেল বা পণ্য বোঝাই আছে, যা সরাসরি অবরোধ ভাঙার কাজে লাগানো যেতে পারে। বাকি ১৩টি জাহাজ এখনো খালি রয়েছে। পাশাপাশি সম্প্রতি বাতিল হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় সাময়িক নিষেধাজ্ঞা শিথিল থাকলেও ইরান তাদের গোপন বহর ব্যবহার বন্ধ করেনি। গত জুন মাসে তারা প্রায় পাঁচ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করে, আর গত সপ্তাহে এক দিনেই রপ্তানি হয়েছে এক কোটি ব্যারেল।

এ ছাড়া ওই তিন সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির সময় হরমুজ প্রণালি পার হওয়া অনেক জাহাজ এখন ফের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছে। এর মধ্যে সাতটি বিশাল ট্যাংকার বর্তমানে ভারত মহাসাগরে ভাসছে, যেগুলোতে অপরিশোধিত তেল বোঝাই রয়েছে এবং আগ্রহী ক্রেতার অপেক্ষায় আছে। এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রথম নৌ-অবরোধ আরোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র, যা ইরানের আমদানি-রপ্তানি কিছুটা সীমিত করলেও পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) মতে, ইরানের মোট রাজস্বের প্রায় অর্ধেক আসে তেল রপ্তানি থেকে। আর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরানের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশই যায় চীনে। অর্থনীতিবিদ আদনান মাজারেই সতর্ক করে বলেন, এই অবরোধের কারণে ইরানে মূল্যস্ফীতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে—গত ১২ মাসে গড় মূল্যস্ফীতি ৫০ শতাংশ, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্বোচ্চ। খাদ্যের মূল্যস্ফীতি ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। সামগ্রিকভাবে ইরানের মোট বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই পারস্য উপসাগরের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এই অবরোধ দেশটির জন্য অস্তিত্বের সংকট তৈরি করতে পারে বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের।