কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার বড়ঘোপ ইউনিয়নের সাগরতীরবর্তী গ্রাম রোমাইপাড়ায় প্রায় চারশ পরিবারের জীবন এখন অনিশ্চিত। পাকিস্তান আমলে নির্মিত মাটির বেড়িবাঁধটি বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কোনো টেকসই সমাধান না পাওয়ায় প্রতিটি জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হচ্ছে ঘরবাড়ি, ভাঙছে বসতভিটা। সেখানকার বাসিন্দা ৭০ বছর বয়সী হাসিনা বেগম জানান, কয়েক দিন ধরে তাঁর ঘরে সাগরের ঢেউ আছড়ে পড়ছে। জীবনে বহু ঝড়-ঝঞ্ঝা দেখেছেন তিনি, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি আগে কখনো দেখেননি। নিজের বসতভিটা সাগরে বিলীন হতে দেখেও কিছু করতে না পারার যন্ত্রণা জানিয়ে তিনি বলেন, ঘর সরিয়ে নেওয়ারও জায়গা নেই। হাসিনা বেগমের প্রতিবেশী লবণচাষি শফিকুল ইসলামের ঘরের কিছু অংশ ইতোমধ্যে ধসে পড়েছে। গত দশ বছরে তিনি পাঁচবার বসতবাড়ি স্থানান্তর করেছেন; পৈতৃক ভিটা সাগরে বিলীন হওয়ার পর এখন শেষ বাড়িটিও হারানোর পথে। কোথায় যাবেন, তা ভেবে কূল পাচ্ছেন না তিনি। একই অবস্থা কাহারপাড়ার বাসিন্দা সখিনা খাতুনের। ষাটোর্ধ্ব এই নারী গত এক দশকে তিনবার বাড়ি স্থানান্তর করেছেন। বর্তমান ঘরটিও ভাঙতে শুরু করেছে। তিনি বলেন, প্রতিটি ঘর ভাঙার সময় মনে হয় শরীরের কোনো অংশ ছিঁড়ে যাচ্ছে। জোয়ার এলে রাতে ঘুম আসে না। পূর্ব তাবলেরচর এলাকার ছমুদা বেগমের বসতঘর গত শুক্রবারের জোয়ারে পুরোপুরি ভেঙে গেছে। পাশের একটি ঘরে আশ্রয় নিলেও নতুন ঘর নির্মাণের চিন্তায় তিনি বিপর্যস্ত। আক্ষেপ করে বলেন, কত ঘরবাড়ি বিলীন ও প্রাণহানি হলেই এলাকাবাসী একটি টেকসই বেড়িবাঁধ পাবে। একই গ্রামের আবু তৈয়ব জানান, নির্বাচন এলে জনপ্রতিনিধিরা বেড়িবাঁধের প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে আর তা মনে রাখেন না। দিনের জোয়ার কোনোমতে সামলানো গেলেও রাতের জোয়ারে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়। সে সময় ঘরে ঘরে আতঙ্ক দেখা দেয়; নারী-শিশুদের নির্ঘুম রাত কাটে। ভাঙনের ঝুঁকি শুধু বাড়িঘরেই সীমাবদ্ধ নয়। আলী আকবরডেইল ইউনিয়নের পূর্ব তাবলেরচর গ্রামে অবস্থিত শত বছরের পুরোনো বায়তুশ শরফ কবরস্থানের পাশের অংশ কয়েক দিনের জলোচ্ছ্বাসে বিলীন হয়েছে। আগামী পূর্ণিমার জোয়ারে কবরস্থানের বাকি অংশও বিলীন হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করছেন স্থানীয়রা। উপজেলার কয়েকটি গ্রাম—রোমাইপাড়া, সাইটপাড়া, কাজিরপাড়া, কাহারপাড়া, কাইছার বাপেরপাড়া, মিয়ারকাটা, আলী আকবর বলীপাড়াসহ অন্তত ১৫টি এলাকায় বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড কুতুবদিয়ার উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আতিকুল ইসলাম জানান, ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধের ১০টি অংশে মেরামত চলছে। তবে নতুন করে পাঁচটি অংশে ভাঙন দেখা দিয়েছে। বরাদ্দ পেলে সেখানেও কাজ শুরু হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ভাঙা বেড়িবাঁধ দ্রুত সংস্কারের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহাফুজ উল্লাহ ফরিদ জানান, চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সৈকতের মতো টেকসই কংক্রিটের বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং বর্তমান ভাঙা বাঁধ দ্রুত সংস্কারের জন্য তিনি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের তাগিদ দিচ্ছেন। জাতীয় সংসদেও বিষয়টি উত্থাপন করেছেন তিনি। বর্তমানে কুতুবদিয়ার বেড়িবাঁধের প্রায় দুই কিলোমিটার অংশ ভাঙা রয়েছে, যার মধ্যে ১০ অংশে সংস্কারকাজ চলছে। কুতুবদিয়া দ্বীপের চারপাশে বেড়িবাঁধের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৪০ কিলোমিটার। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে বাঁধের ২০ কিলোমিটার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই ভাঙা বাঁধ মেরামতের নামে হাজার কোটি টাকা খরচ হলেও টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা হয়নি বলে জানান উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মনজুর আলম সিকদার। তিনি বলেন, গত তিন দশকে অন্তত ৪০ হাজার বাসিন্দা দ্বীপ ছেড়েছেন। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কুতুবদিয়া শাখার সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম উল্লেখ করেন, ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের সময় কুতুবদিয়ায় ১২ কিলোমিটার প্যারাবন (ম্যানগ্রোভ) ও ঝাউবন ছিল। বর্তমানে পূর্ব-দক্ষিণাংশে তিন কিলোমিটারের মতো প্যারাবন এবং উত্তর-পশ্চিমাংশে দুই কিলোমিটারের মতো ঝাউবাগান রয়েছে। প্রভাবশালী মহল সেই বনও উজাড় করে চিংড়িঘের ও লবণ চাষের মাঠ তৈরি করছেন। তার মতে, ১৯৯১ সালের মতো শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানলে দ্বীপের বহু মানুষের মৃত্যু ঘটবে। গবেষণার তথ্য বলছে, পাঁচ দশকে কুতুবদিয়া দ্বীপের মোট স্থলভাগের প্রায় ৬৬ শতাংশ হারিয়ে গেছে। বাংলাদেশ জার্নাল অব সায়েন্টিফিক রিসার্চে প্রকাশিত এক গবেষণায় ১৯৭২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দক্ষিণ দিকে বছরে গড়ে প্রায় ৩৩ দশমিক ৭ মিটার এবং পশ্চিম দিকে ৫ দশমিক ৬ মিটার হারে ভূমি সাগরে বিলীন হচ্ছে। কোস্ট ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, কুতুবদিয়ার ভাঙন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত জলবায়ু বিপর্যয়। টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ও প্রকৃতিনির্ভর সুরক্ষাব্যবস্থা গ্রহণ করাই দ্বীপ বাঁচানোর একমাত্র পথ।